সৌমিত্রের উত্তরাধিকার

✍️প্রিয়রঞ্জন কাঁড়ার

সৌম্যদর্শন এই দক্ষ পেশাদার অভিনেতার কাছ থেকে আমরা বাঙালিরা ঠিক কী পেয়েছি?
সৌমিত্র-অভিনীত চরিত্রগুলি সব সময়ই যে জীবনের সব বাজি জিতে বাজিগর হয়ে আমাদের অনুপ্রেরণার সুনামিতে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছে, এমনটা তো মোটেই নয়। “অগ্রদানী”-র সেই লোভী-গরিব পুণ্যবামুন তো পরাজয়ের মূর্ত প্রতীক। আত্মজাকে দেহ-ব্যাবসায় নিয়োজিত দেখে যে বাবা শোক অনুভব করার সুযোগটুকু পর্যন্ত না পেয়ে দুর্গাপূজার চাহিদা মেটাতে সেখান থেকেই “বেশ্যামাটি” সংগ্রহ করে, অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে আত্মজের পিণ্ড ভক্ষণ করে, সে তো সামাজিক বিচারে “নির্লজ্জ, অপদার্থ”। আবার “ঘরে-বাইরে” ছবির বিবেক-বর্জিত আগ্রাসী সন্দীপের ভোগবাদী রাজনৈতিক দর্শন সমাজের কোন কাজে লাগে? “গণশত্রু”-র ড. অশোক গুপ্তের নখ-দন্তহীন হাত-পা বাঁধা আদর্শবাদও সেভাবে রক্তে ঢেউ তুলতে পারে কই? ” বেলাশেষে”-র প্রবীণ বিশ্বনাথ এমন একটি দিগভ্রান্ত ভঙ্গুর চরিত্র, যার আত্ম-অনুসন্ধানের পিছনেও আত্ম-প্রত্যয়ের পোক্ত ভিত গরহাজির।
এবার আসা যাক আসল কথায়। চরিত্রগুলির যাবতীয় ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতার মেঘলা আকাশেই অভিনেতা সৌমিত্রের প্রতিভার রোদ্দুর প্রতিবার জীবনের রামধনু নির্মাণ করে। আমরা জীবনকে তার সাত রঙ সমেত চিনতে ও ভালোবাসতে শিখি। জল-সাম্রাজ্যে কোনির চোখ-ধাঁধানো সাফল্যের ক্লাইম্যাক্স মতি নন্দীর ব্যক্তিগত রোম্যান্টিসিজম, সৌমিত্রের ক্ষিদদা কোনিকে অতল জলের আহ্বান শুনিয়েই পরিতৃপ্ত। সেই আহ্বানে কে কীভাবে কতখানি সাড়া দিতে পারবে, তার ওপর ক্ষিদদা বা সৌমিত্রের জীবন-আবেগের সূচক ওঠানামা করে না। ক্ষুরধার মস্তিষ্কের ফেলুদা হোক বা অপরিশীলিত রুক্ষতার ট্রাকচালক নরসিংহ, অপরিণামদর্শী অমল হোক বা বিগড়ে যাওয়া ময়ূর বাহন, সৌমিত্র তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলি দিয়ে ভেলা বেঁধে জীবনের খরস্রোতে আমাদের সওয়ারি করিয়েছেন। সেই নদীর ঘোলাটে নোনতা জলের প্রতিটি বিন্দুর স্বাদ চিনিয়েছেন। আমরা কোনির মতোই “যন্ত্রণায় মরে” গিয়েও সেই জলের তলায় অমৃতের সন্তান হওয়ার ডাক শুনেছি।
শ্রীচরণেষু সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যে বিপুল শিল্প-গৌরবের উত্তরাধিকার আপনি বাঙালিকে দিয়ে গেলেন, যে অন্তহীন প্যাশন ও রোম্যান্টিসিজমে বাঙালি-মননকে সিক্ত করে গেলেন, কালের যাত্রায় তার কোনও ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নতুন ভুবনে ভালো থাকুন, তাড়াতাড়ি নবরূপে এই ভুবনে ফিরেও আসুন।

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *