চিরকিশোর

চিরকিশোর

আজ আমাদের সকলের প্রিয় প্রতিভাবান গায়ক কিশোর কুমারের ৯১ তম জন্মদিন। ১৯২৯ সালে আজকের দিনেই পৃথিবী আলোকিত করেছিলেন তিনি।মৃত্যুর পর কেটে গিয়েছে ৩৩ বছর।তবু তিনি অমলিন।চির ভাস্বর।বাংলা তথা দেশের সংগীতপ্রেমী মানুষের মনের মণিকোঠায় তাঁর স্থান চিরকালীন।আজও তিনি চির কিশোর।যে কৈশোরের ছোঁয়া তিনি দিয়েছিলেন কিশোর মনে,সেই ছোঁয়া প্রতিটি সঙ্গীত প্রেমীর হৃদয়ে চিরশাশ্বত হয়ে রয়ে গিয়েছে।আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে আমরা স্মরণ করবো।

পারিবারিক জীবন

১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট ভারতের মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর খান্ডোয়ালের ছোট গলির ছোট্ট এক বাড়িতে জন্ম কিশোর কুমারের। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বাবা আইনজীবী। বড় ভাই ভারতের চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম দিকপাল অশোক কুমার। বলিউডের সবাই তাকে দাদামণি বলে ডাকত। বড় ভাই আর কিশোর কুমারের মাঝে বয়সের পার্থক্য ১৮ বছর। কিশোরের আসল নাম ছিল আভাস কুমার গাঙ্গুলি। ছোটবেলা থেকেই অন্যকে নকল করে দেখানোর শখ ছিল। সবাইকে নকল করে বেড়াতেন। আর শখ ছিল ইওডেলিংয়ের, যেখানে বিভিন্ন পিচে সুর করে গাইতে হয়। ভারতে কিশোরই প্রথম ইওডেলিং আনেন।

গাইতে গাইতে গায়েন

কী ছিল তার কণ্ঠে? কী যেন একটা ছিল, যা শুনলেই মনে হয় কণ্ঠটা চুম্বকের মতো টানে। কোমল, মধুর, কখনো দরাজ ছিল তার কণ্ঠ। অথচ শুরুতে গানের তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না তার। জীবনকালে খুব একটা সাক্ষাৎকার না দিলেও আড্ডা-আলাপচারিতায় তিনি এমনটাই বলেছেন। কিশোর কুমার বরাবরই স্বীকার করে এসেছেন, তিনি সংগীত বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন। মন থেকেই তার গান গাইতে ভালো লাগত।

হঠাৎ সুরের পরিবর্তন

ছোটবেলায় নাকি তার গানের গলা ভালো ছিল না একদম। অশোক কুমার পরে বিভিন্ন জায়গায় বলেছিলেন, একবার কিশোর কুমার পায়ে আঘাত পেয়েছিলেন। সেই আঘাত পাওয়ার পর তিন-চার দিন নাকি তিনি শুধু কেঁদেছেন। সেই কান্নার পর তার গলায় কী এক পরিবর্তন এলো, গলায় সুর চলে এলো, আওয়াজ পরিবর্তন হয়ে গেল।

দেব আনন্দের কণ্ঠে কিশোরের গান

১৯৪৯ সালে প্রথম জিদ্দি চলচ্চিত্রে বিখ্যাত অভিনেতা দেব আনন্দের জন্য গান গেয়ে চলচ্চিত্র জগতে পদচারণা শুরু করেন। এরপর ১৯৫১ সালে আন্দোলন চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে কাজ করেন। ১৯৫৪ সালের পর থেকে নউকরি, নিউ দিল্লী, আশা, চালতি কা নাম গাড়ি, হাফ টিকিট, পারোসান, ঝুমরু ইত্যাদি চলচ্চিত্রে কাজ করেন। এগুলোর সবকটিতেই গান গেয়েছেন শুধু নিজের জন্য। ১৯৬৮ সালের আগ পর্যন্ত তিনি হয় নিজের জন্য, না হয় দেব আনন্দের জন্য গেয়েছেন। অন্য কোনো অভিনেতার জন্য নয়। এ সময় অভিনয় করলেও তার চলচ্চিত্রগুলোর সংগীত পরিচালনা করেছেন সলীল চৌধুরী, এস ডি বর্মণের মতো বিখ্যাত সংগীত পরিচালক। এ সময়ে তার বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে ছিল-ছোটা সা ঘার হোগা বাদাল কী ছাও মে (নউকরি), ইনা মিনা ডিকা (আশা), নাখরে ওয়ালি (নিউ দিল্লী), পাঁচ রুপিয়া বারা আনা, এক লারকি ভিগি ভাগি সি (চালতি কা নাম গাড়ি), চিল চিল চিল্লাকে (হাফ টিকিট) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

নায়ক থেকে গায়ক

১৯৬৫ সালের পর ধীরে ধীরে নায়ক হিসেবে দর্শকরা আর তাকে গ্রহণ করছিল না। এতে তিনি অনেক বিমর্ষ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে দর্শকের জন্য গান গাইতে থাকলেন। চলচ্চিত্রে যেহেতু তিনি নিজের এবং দেব আনন্দের জন্য ছাড়া অন্য কোনো নায়কের জন্য গান গাননি, তাই সেখানেও কাজ কমে যাচ্ছিল। এমন সময় শচীন দেব বর্মণ তাকে দিয়ে গান গাওয়ালেন। নায়ক ছিলেন তখনকার সদ্য ইন্ডাস্ট্রিতে আসা রাজেশ খান্না। চলচ্চিত্রটির প্রতিটি গান দর্শকরা পছন্দ করল। কিশোর কুমার হয়ে গেলেন সুপার হিট গায়ক। এরপর থেকে বলিউডের সবাই কিশোর কুমারকে দিয়ে তাদের গান গাওয়ানোর জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়লেন।

অমিতাভের জন্য গান

কিংবদন্তি নায়ক অমিতাভ বচ্চনের জন্য গান করেন কিশোর কুমার। এক পর্যায়ে দেখা গেল, অমিতাভের ছবি মানেই সেখানে কিশোর কুমারের নাম থাকবে। এর অন্যথা যেন হতেই পারে না। এ সময় এস ডি বর্মণের সুপুত্র রাহুল দেব বর্মণের সংগীত পরিচালনায় গান গাওয়া শুরু করেন কিশোর। এখানেও সফল হলেন। একের পর এক দর্শক প্রিয় গান দিয়ে যাচ্ছিল এ জুটি।

উত্তম কুমারের জন্য গান

তিনি শুধু যে হিন্দি গানেই দর্শকের মন জয় করেছেন তা নয়।তিনি বাংলা গানেও সমানভাবে রাজত্ব করেছেন।উপহার দিয়েছেন বহু বাংলা হিট গান। মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্য গেয়েছেন তিনি অনেক গান। আমার স্বপ্ন তুমি ওগো চির দিনের সাথী, আশা ছিল ভালোবাসা ছিল, যদি হই চোর কাঁটা, এই তো জীবন, নারীর চরিত্র বেজায় জটিল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

সত্যজিৎ রায়ের জন্য গান

সত্যজিৎ রায়ের জন্য রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছেন তিনি। তার ‘চারুলতা’ চলচ্চিত্রে ‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে’ গানটি গেয়েছিলেন। আবার তার ‘ঘরে বাইরে’ চলচ্চিত্রেও গান করেছিলেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের মতে, কিশোর কুমারের গানের গলা চলচ্চিত্রের যেকোনো পরিস্থিতির দৃশ্যে মানিয়ে যায়।

সংসার জীবনে উত্থান-পতন

এই অসামান্য শিল্পী সংসার জীবনে নানা উত্থান-পতনের সম্মুখীন হয়েছেন। চারবার বিয়ে করেছিলেন কিশোর কুমার। প্রথম বিয়ে করেন রুমা গুহ ঠাকুরতাকে। রুমাও কিশোরের মতো একাধারে অভিনয় ও সংগীতশিল্পী। ১৯৫১ সালের মে মাসে মুম্বাইয়ে কিশোর কুমারের সঙ্গে রুমার বিয়ে হয়। রুমা দাবি করেন, কিশোর চেয়েছিলেন তিনি যেন তাদের সংসার সামলান। কিন্তু রুমা কাজ চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এ নিয়েই দ্বন্দ্ব শুরু হয় দুজনের। ১৯৫৮ সালে তাদের বিচ্ছেদ হয়। কিশোর কুমার এরপর বলিউডের মেরিলিন মনরো-খ্যাত মধুবালাকে বিয়ে করেন। মধুবালার পরিবারের শর্ত ছিল, বিয়ে করতে হলে কিশোর কুমারকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। তাই ধর্মান্তরিত হয়ে করিম আবদুল নাম নেন কিশোর কুমার। বিয়ের এক মাসের মধ্যেই কিশোর কুমার বাড়ি ছেড়ে মুম্বাইয়ের বাংলোয় নিয়ে আসেন মধুবালাকে। সেখানেই নয় বছর অসুস্থ মধুবালার সঙ্গে সংসার করেন। ১৯৬৯ সালে মধুবালা মারা যান।

কিশোর কুমারের তৃতীয় স্ত্রী বলিউড অভিনেত্রী যোগিতা বালি। মাত্র দুই বছর সংসারের পর ১৯৭৮ সালে বিচ্ছেদ। এরপর কিশোর কুমার ১৯৮০ সালে বলিউড অভিনেত্রী লীনা চন্দ্রভারকারকে বিয়ে করেন। তাদের বয়সের ব্যবধান ছিল ২১ বছর। লীনার বাবার এ বিয়েতে মত ছিল না। ১৯৮৭ সালে কিশোর কুমারের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লীনা চন্দ্রভারকারই ছিলেন তার জীবনসঙ্গী। লীনার ঘরে কিশোর কুমারের আরেকটি ছেলের জন্ম হয়।

কিশোর কুমারের সিক্রেট

১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ায় জন্ম নেন কিশোর কুমার। আসল নাম আভাস কুমার কাঞ্জিলাল গাঙ্গুলি। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। একাধারে ছিলেন গায়ক, অভিনেতা, প্রযোজক, পরিচালক, চিত্র নাট্যকার ও গীতিকার। তার প্রয়াণ দিবসে কিশোর সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য।

১. অশোক কুমারের কাছে এক ব্যক্তিগত কাজে গিয়েছিলেন গায়ক-সংগীত পরিচালক শচীন দেব বর্মণ। সেখানে কিশোর কুমারকে গাইতে শুনে সে দিনই ছবিতে গান গাওয়ার জন্য রাজি করান তাকে।

২. ৭০ দশকের মাঝামাঝিতে তার প্রযোজনায় একটি ছবিতে অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয়ে অস্বীকৃতি জানালে অমিতাভ বচ্চনের জন্য গান না গাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কিশোর কুমার।

৩. ১৯৭৫-৭৭ সালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করে রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠান ও মাধ্যম থেকে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। রেডিওতে তার গান প্রচার বন্ধ করা হয়, এমনকি দ্বৈত সংগীতগুলো থেকে তার গাওয়া অংশগুলো কেটে দেওয়া হয়।

৪. মধুবালাকে বিয়ে করার জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নাম নেন করিম আবদুল।

৫. যত বড় পরিচালকই হোক না কেন, সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক না পাওয়া পর্যন্ত গান রেকর্ডিং করতেন না।

৬. লতা মুঙ্গেশকরের অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। তার সম্মানে সব সময় পারিশ্রমিক নিতেন লতার চেয়ে এক টাকা কম।

৭. তার অভিনয়ে পাগলামির ছাপ ছিল স্পষ্ট, যা তিনি ইচ্ছা করেই তৈরি করেছিলেন। এমনকি খান্ডোয়ায় তার বাড়ির সামনে নিজেই ‘মেন্টাল হসপিটাল’ লেখা সাইনবোর্ড লাগিয়েছিলেন।

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *