কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা সোমেন মিত্র ছিলেন খুব জনদরদী মানুষ…

কংগ্রেসের বর্ষীয়ান নেতা সোমেন মিত্র ছিলেন খুব জনদরদী মানুষ…

লিখছেন সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ আইচ

সোমেন মিত্র-র সঙ্গে সাংবাদিক ইন্দ্রজিৎ আইচ

আমি কংগ্রেসের সোমেন মিত্র কে ১৯৮৪ সাল থেকে চিনি। আমি কাঁকুরগেছি তে থাকতাম। মামার হাত ধরে স্কুলে আসতাম। পড়তাম শিয়ালদহ মিত্র ইনস্টিটিটিউনে। তখন আমার কত বয়স হবে, এই আট বা নয় হবে।ক্লাস ৩ অথবা ৪ এ পড়ি। সোমেন মিত্র আমাদের স্কুলে এসেছিলেন বার্ষিক অনুষ্ঠানে পুরস্কার দিতে। আমি ওনার হাত থেকে ভালো রেজাল্ট এর জন্য প্রাইজ নিয়েছিলাম। মনে আছে পুরস্কার হিসেবে বই উপহার পেয়ে ছিলাম। যাই হোক সেই প্রথম দেখা ওনাকে। সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পড়া এক অন্য মানুষ।কথা বললেন আমার সাথে, কোন বিষয়ে কত নম্বর পেয়েছি, বড় হয়ে কি হতে চাই , আমি সেই সময় ওনাকে বলেছিলাম বড় হয়ে সাংবাদিক হব, উনি সেই কথা শুনে খুব অবাক হয়ে ছিলেন। এতটুকু ছেলে বলে কি? তত কালীন স্কুলের প্রধান শিক্ষক
বাঁশরীমোহন ভট্টাচার্য কে তিনি বল্লেন এই ছেলেটা বড় হয়ে সাংবাদিক হবে। এর লেখাপড়ায় একটু নজর দেবেন। পিঠ চাপড়ে আমায় উৎসাহ দিয়ে গেলেন। সেই শুরু। আমার মামারাও এই স্কুল থেকে পাস করেছে। খুব নাম ছিল সেই সময় এই বাংলা মিডিয়াম স্কুলের। খুব ভালো রেজাল্ট হতো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এর। যাই হোক সোমেন মিত্র যেহেতু আমোস্ট স্ট্রিট এর বিধায়ক ছিলেন তাই তিনি স্কুলের নানা মিটিং এ আসতেন। বিদ্যালয় পরিচালন কমিটির সাথে ও যুক্ত ছিলেন। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হোক বা স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হয়ে আসতেন দেখেছি। অনেকবার দেখা হয়েছে, আমায় সেই সূত্রে উনি চিনতেন। উনি প্রতিবছর বিরাট করে কালি পুজো করেন। সেই পুজোয় আমরা বন্ধুরা যেতাম। প্রসাদ খেতাম ওনার পাড়ায়।খুব ভালোবাসতেন। গল্প করতেন। লেখাপড়ার কথা জানতে চাইতেন। সব থেকে বড় কথা উনি যেখানে থাকতেন সেই আমোস্টস্ট্রিট কার্তিক বোস লেবোটারি র সামনে সপ্তাহে দুদিন ভোরবেলায় আমাদের মিত্র স্কুলের মাস্টারমশাই সঞ্জিত কুমার বসুর কাছে অঙ্ক আর পধার্ত বিদ্যা পড়তে যেতাম। যত বার গেছি, যত দিন গেছি ওনার সাথে দেখা হতো। কথা হতো। উনি আমার স্যারকে চিনতেন।এই ভাবে আমি ওনার পরিচিত হয়ে উঠতে পেরেছিলাম। পরবর্তী সময়ে মাধ্যমিক পাস করে যখন শিয়ালদহ টাকি স্কুলে ভর্তি হই তখন ও যোগাযোগ ছিলো আমাদের।আমায় উনি বলতেন যদি কোনো দরকার বা প্রয়োজন হয় আমার কাছে এসো। যদিও কোনোদিন কোনো সুবিধে নিইনি। আমায় জীবনে অনেক কষ্ঠ করে পড়াশুনা করতে হয়েছে। টাকি থেকে উচ্ছ মাধ্যমিক পাস করে তার পর বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হই।তারপর বেশ কিছু বছর আমাদের মধ্যে আর যোগাযোগ ছিলো না, তবে আমায় উনি আমায় চিনতেন লেখাপড়ার পাশাপাশি জাদুকর হিসাবে। আমার জাদুও দেখেছেন। সেই প্রসংসা ও পেয়েছি ওনার থেকে। তারপর সময় এর সাথে নিজের জীবন, নিজের নানা কাজের মধ্যে দিয়ে অনেক টা সময় পার হয়েছে নদীর মতন। বহু বছর পরে শিয়ালদহ তে আমার এক পরিচিত শিল্পীর বাড়িতে ওনার সাথে দেখা। প্রথমে উনি আমার চিনতে পারেনি। আমি পরিচয় দিতে উনি অবাক, কারণ আমার মুখ, চেহারা অনেকটা বদলে গেছে। তারপর অনেক কথা, অনেক স্মৃতি, এও শুনলেন আমি সাংবাদিক হয়েছি, লিখছি, খুব খুশি হলেন, সৎ ভাবে কাজ করার উৎসাহ দিলেন। আমায় উনি ওনার মোবাইল নম্বর দিলেন। আবার নতুন করে আমাদের যোগাযোগ গরে উঠলো। তারপর আমাদের বাগুইহাটি তে নানা পাটির মিটিং, কারোর কোনো অনুষ্ঠানে অথবা কলকাতা প্রেস ক্লাবে এমন কি ওনার পাড়ায় কালি পুজোয় দেখা হয়েছে আমাদের। প্রেস ক্লাবে এলে ওনার প্রিয় খাবার ছিল সিঙারা আর চা। ব্যাক্তিগত জীবনে বহু মানুষের উপকার করেছেন। সব থেকে বড় কথা মধ্যে কলকাতা মানেই সোমেন মিত্র..আমাদের আমোস্টস্ট্রিট এর ছোটদা। ছাত্র রাজনীতি থেকে নকশাল আন্দোলন, কংগ্রেস থেকে তৃণমূল আবার কংগ্রেস করা সত্তর এর দশক থেকে উত্তাল রাজনীতি দীর্ঘ ৬০ বছর এর তার রাজনৈতিক জীবন এ কি কম বড় কথা। আজ তার পরিসমাপ্তি ঘটলো। সব স্মৃতি হয়ে রইলো আমার সাংবাদিক জীবনের স্মৃতির পাতায়। হারালাম আমার এক প্রিয় মানুষকে। তাকে প্রণাম জানাই ও তার আত্মার শান্তি কামনা করি।🙏🙏

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *