স্মরণে প্রফুল্ল চন্দ্র রায়

0
21

বাঙালির কাছে তিনি বিজ্ঞানী, ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের কাছে তিনি বিপ্লবী।তাঁর নিজের ভাষায়-‘আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ,কিন্তু এমন সময় যখন আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহ্বানে সাড়া দিতে হয়।’ তিনি আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বিজ্ঞানী যিনি “ভারতীয় ওষুধের জনক” হিসাবে ভূষিত হন। তিনি ছিলেন একজন বাঙালি রসায়নবিদ, শিক্ষক, দার্শনিক এবং কবি। যিনি বাংলাদেশের খুলনা জেলায় এক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শৈশব থেকেই এই মহান ব্যক্তির সব কিছুর উপর প্রবল আগ্রহ ছিল। তার আবিষ্কৃত ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’ বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করেছিল। তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় অতি দরিদ্রদের সেবা করে এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে অবদান রেখেছিলেন। আজ আমরা মহান বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের জন্মদিন।তাঁকে স্মরণ করে তাঁর জীবনের গল্প আজ আমরা জানব।

১৮৬১ সালে ২ আগস্ট, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বাংলাদেশের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাডুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন হরিশচন্দ্র রায় এবং মা ভুবনমোহিনী দেবী।তাঁর ডাক নাম ছিল ফুলু।পিতা হরিশচন্দ্র রায় সেখানকার জমিদার ছিলেন।পাশপাশি পন্ডিত ও বহুভাষাবিদ।ছিলেন এক কিংবদন্তি সুর ও সংগীতসাধক। শৈশব থেকে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় প্রত্যেক বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ ছিলনে।ছোটবেলাতেই প্রফুল্লচন্দ্রের মেধার বিকাশ ঘটে। বইপড়ার নেশায় খাবারে অনিয়ম হতো এবং ছোটখাটো অসুখ-বিসুখকে তোয়াক্কা করতেন না। অুসস্থতার জন্য স্কুলে যাওয়াও বন্ধ রাখতে হতো। সেই সুুযোগ তিনি পড়ে নিতেন শেক্সপিয়র, কার্লাইল, এমার্সন, ডিকেন্স প্রমুখের রচনা ও বাংলা সাহিত্য গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে আচার্যদেব অধ্যয়নে ব্রতী হয়েছিলেন।

তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত এম ই স্কুল থেকে তার পড়াশোনা শুরু হয়। এবং পরে ১৮৭২ সালে কলকাতায় এসে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। তবে রক্ত আমাশায় রোগের জন্য তাকে আবার গ্রামে ফিরে যেতে হয়। দুইবছর পরই ১৮৭৪ সালে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং সেখানে অ্যালবার্ট স্কুলে ভর্তি হন।
১৮৭৯ সালে অ্যালবার্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করার পরে, তিনি ‘বিদ্যাসাগর কলেজ’ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। তবে সেখানে বিজ্ঞানের বিষয় পড়ানোর কোনও সুবিধা না থাকায় তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজ(বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন নিয়ে পড়াশুনা করেন।এ সময় তিনি গিলক্রিস্ট বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেন।১৮৮২ সালে বাংলার প্রফুল্লচন্দ্র ও বোম্বাইয়ের বাহাদুরজী নামে আরেক ছাত্র গিলক্রিস্ট বৃত্তি অর্জন করেছিলেন।একমাস জাহাজ যাত্রার পর তিনি ইংল্যান্ডে পৌঁছে ১৮৮২ সালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা, রসায়নবিদ্যা ও প্রাণিবিদ্যা নিয়ে বিএসসি তে ভর্তি হন।সেখান থেকে তিনি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন পড়েন। পরবর্তীকালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েই পিএইচ ডি ও ডি এসসি ডিগ্রী লাভ করেন। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেন এবং পরে তার এই গবেষণার জন্য তাকে হোপ প্রাইজে ভূষিত করা হয়।
পড়াশুনো শেষ করে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় আরও এক বছর গবেষণা চালিয়ে যান পরে ১৮৮৮ সালে কলকাতায় ফিরে আসে। পরের বছর তিনি শহরের ‘প্রেসিডেন্সি কলেজ’ এ অস্থায়ী পদে নিযুক্ত হন। ভারত যেহেতু ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল তাই তাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চপদস্থ অবস্থান থেকে দূরে রাখা হত। যদিও তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছিলেন।
১৮৯৬ সালে তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট (HgNO2) নিয়ে তাঁর গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করেছিলেন; তিনি স্থিতিশীল যৌগিক পারদর্শী নাইট্রাইট তৈরি করেছিলেন এবং এটি অন্যান্য বিজ্ঞানীদের ধাতব নাইট্রাইট এবং অ্যামাইনগুলির অধ্যয়ন করতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তিনি নিজের গবেষণায় বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা তৈরি করেছেন এবং পরে ১৯০১ সালে কলকাতায় মানিকতলার ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তর করা হয়। এবং মানিকতলায় স্থানান্তরিত করার পর “বেঙ্গল কেমিক্যাল” নাম পরিবর্তন করে বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড রাখা হয়।
পরের কয়েক বছর, তিনি বিজ্ঞানের উপর অনেক প্রাচীন গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছিলেন এবং ১৯০২ সালে ‘A History of Hindu Chemistry from the Earliest Times to the Middle of Sixteenth Century’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি এর পরেও গ্রন্থ অধ্যয়ন নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। ছয় বছর পর তার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।প্রেসিডেন্সি কলেজে ২৪ বছর অধ্যাপনা করে চাকরি ছেড়ে দেন এবং কলকাতার রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে রসায়ন অধ্যাপনা শুরু করেন। সেই সময় তিনি প্ল্যাটিনাম এবং ইরিডিয়াম এবং জৈব পদার্থের সালফাইডের মতো রূপান্তর-ধাতুর যৌগগুলি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।
১৯২০ সালে বিশিষ্ট রসায়নবিদ একশোরও বেশি বৈজ্ঞানিক সাহিত্য লিখেছেন এবং তাদের অনেকগুলি “ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল সোসাইটি” জার্নালে প্রকাশিত হয়েছিল। ওই একই বছর তিনি “ইন্ডিয়ান সায়েন্স কংগ্রেস” সভার সভাপতিত্ব করেন, যা দেশের অন্যতম বৈজ্ঞানিক সমিতি।
তিনি তাঁর শিক্ষকতা এবং গবেষণার পাশাপাশি একজন প্রখ্যাত সমাজসেবকও ছিলেন। ১৯৩৩ সালে যখন বাংলা রাজ্য বৃহত্তর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল বেঙ্গল রিলিফ কমিটি’ গৃহহীন ও নিঃস্বদের মাঝে বিতরণ করে আড়াই মিলিয়ন ডলার অর্থ ও পণ্য সংগ্রহ করেছিল।
তিনি একজন সাহসী পাঠক এবং সাহিত্যের প্রেমিক যে নিজে তার জীবন কাহিনী লিখেছিলেন ‘একটি বাঙালি রসায়নের জীবন ও অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক একটি বইতে। তিন বছর পর তার আত্মজীবনীটির দ্বিতীয় সংস্করণ নিয়ে এসেছিলেন।
আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কারে করে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন।
তিনি তাঁর জীবনে পাঁচটি থায়োএস্টার এবং বারোটি যৌগিক লবণ আবিষ্কার করেন।১৯১৮ সালে বাগেরহাট জেলায় পি, সি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
শিক্ষকতার জন্য তিনি “আচার্য” হিসেবে খ্যাত।
ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী দেওয়া হয়।১৯৪৪ সালে ১৬ জুন এই খ্যাতিমান ভারতীয় বিজ্ঞানী কলকাতার নিজের বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here