Anando Sangbad Live

শতবর্ষে বিস্মৃতির অতলে কালী

✍️সোমনাথ লাহা

(সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণালের ছবিতে নিজের অভিনয়ের মণিমুক্তো ছড়ানো বাংলা স্বর্ণযুগের দিকপাল অভিনেতা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ চলে গেল নিঃশব্দেই। শতবর্ষে এই মহান অভিনেতার প্রতি তাই র‌ইল এই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি )

“এই মজার মজার ভেলকি দেখো, আজব তাজ্জব সার্কাস দেখো… প্যায়ারিলালের খেলা দেখে যাও’… অগ্রদূত পরিচালিত ‘বাদশা’ ছবির এই গানের মতোই বাংলা ছবিতে আক্ষরিক অর্থেই নিজের অভিনয় প্রতিভার ভেলকি তথা স্বাক্ষর রেখেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। উত্তমকুমার- সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-ছবি বিশ্বাস- তুলসী চক্রবর্তী- পাহাড়ি সান্যাল-কমল মিত্র-বিকাশ রায়- ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-জহর রায়ের মতো পর্দা আলো করে রাখা অভিনেতাদের ভিড়েও নিজের অভিনয় প্রতিভায় ও অনন্য স্বকীয়তায় বাংলা ছবিতে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন ও ঋত্বিক ঘটকের, আরও ভালো করে বললে এই এয়ীর ছবিতে নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখা কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মশতবর্ষ অতিক্রান্ত হল প্রায় নিঃশব্দেই। ১৯২০সালের ২০ নভেম্বর কলকাতাতেই জন্ম কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের।লেকমার্কেটে ছিল তাঁদের পৈতৃক বাড়ি। তবে তাঁদের পিতৃপুরুষের আদি নিবাস ছিল পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিক্রমপুরে। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল, লাঠিখেলায় পারদর্শী কালী বন্দ্যোপাধ্যায় পরবর্তীকালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বাড়িতে না বলে নাম লিখিয়ে বসেন এয়ারফোর্সে। পাঞ্জাবে ট্রেনিং নিতে যাওয়া সেই ছেলেকে সেসময় ফিরিয়ে নিয়ে আসেন তাঁর বাবা। এরপরেও দিল্লি ওয়ারলেস হেডকোয়াটার্সে চাকরি নিয়ে তিনি চলে গেলেও তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের হিংস্রতা দেখে ফিরে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় ফিরে দোভাষীর কাজ নেন আমেরিকান সেনা হাসপাতালে। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় তাঁর জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। এরপরেই তিনি পা রাখেন চলচ্চিত্রের অঙ্গনে। পরিচালক হিরন্ময় সেনের ‘বার্মার পথে’ ছবিতে তুলসী নামক খল চরিত্রের হাত ধরে বাংলা ছবিতে আত্মপ্রকাশ ঘটে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তবে সাফল্য আসে ‘বরযাত্রী’ ছবিতে তোতলা গণেশের চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে। এই চরিত্রটি তাঁকে যে শুধু খ্যাতি এনে দিয়েছিল তাই নয়, দেয় পরিচিতিও। এরপরে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে। উত্তমকুমার-সুচিত্রা সেনের রোম্যান্টিক ছবির ভিড়ে নিজেকে নিয়ে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সাহস দেখিয়েছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের চরিত্রকে সেলুলয়েডে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি। বাংলা ছবির স্বর্ণযুগে কালী বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সেই অন্যতম অভিনেতা, যিনি সত্যজিৎ-ঋত্বিক-মৃণাল এই এয়ীর সঙ্গে কাজ করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের ‘পরশপাথর’ ছবিতে পরশ দত্তের সেক্রেটারি প্রিয়তোষের চরিত্রে তাঁর অভিনয় ভোলবার নয়। আবার সত্যজিতের আরেকটি ছবি ‘তিনকন্যা’ র ‘মণিহারা’ -তে তিনিই ফণীভূষণ। ঋত্বিক ঘটকের ‘অযান্ত্রিক’ ছবিতে বিমল চরিত্রটিকে পর্দায় একদম রক্তমাংসের মানুষ করে তুলেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। শেফরোলেট গাড়ি, যা কিনা বিমলের প্রিয় জগদ্দল.. সেই গাড়ির প্রতি তার ভালোবাসাকে সুনিপুণ দক্ষতায় পর্দায় মেলে ধরেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও ঋত্বিকের আরেকটি ছবি ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’-তে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বৃদ্ধের ছদ্মবেশধারী যুবক ফেরিওয়ালা। এমনকি ঋত্বিক ঘটকের ‘নাগরিক’ ছবিতেও কাজ করেন তিনি। আর মৃণাল সেনের ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে তাঁর অভিনীত চিনা ফেরিওয়ালা ওয়াংলুর চরিত্রটি এক কথায় বাংলা ছবির একটি অন্যতম আইকনিক চরিত্র। ছবিতে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অসাধারণ অভিনয় দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জ‌ওহরলাল নেহেরুর। এর পাশাপাশি ‘ডাকহরকরা’ ( দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই ছবির প্রিন্ট নষ্ট হয়ে গিয়েছে) ছবিতে ডাকহরকরা চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছিল দর্শকমহলে। তপন সিংহর সঙ্গেও বেশ কয়েকটি অসাধারণ ছবিতে কাজ করেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। বলা ভালো একদম শুরুর দিক থেকেই। তপন সিংহর ‘অঙ্কুশ’,হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’, ‘টনসিল’ ‘কাবুলিওয়ালা'( ছবিতে রহমতরূপী ছবি বিশ্বাসের জেলমেটের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন), ‘লৌহকপাট’-এ নরঘাতী ফকির, ‘এক যে ছিল দেশ’-এ অসাধু ব্যবসায়ী, যিনি বেবিফুডের কালোবাজারি করেন, এমন সব চরিত্রে নিজের বলিষ্ঠ অভিনয়ের পরিচয় রেখেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। এমনকি উত্তমকুমারের সঙ্গে ‘সোনার হরিণ’ ও ‘কখনো মেঘ’ এর মতো ছবিতে গ্রে শেডেও তিনি অনন্য। অগ্রদূত পরিচালিত’বাদশা’ ছবিতে মূল চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনন্য অভিনয় কখনোই ভুলে যাওয়ার নয়। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাট্যমঞ্চেও তিনি ছিলেন অসামান্য দক্ষ একজন অভিনেতা। তাঁর অভিনীত বেশিরভাগ নাটকগুলিই মঞ্চ সফল। ‘প্রজাপতি’, ‘ক্ষুধা’ র মতো নাটকে তাঁর অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছিল দর্শকমহলে। পরবর্তী সময়ে চরিত্রাভিনেতা হিসাবেও কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় ছিল মনে রেখে দেওয়ার মতোই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে দীনেন গুপ্ত পরিচালিত ‘দেবী চৌধুরাণী’ তে প্রফুল্ল রূপী সুচিত্রা সেনের দোর্দন্ডপ্রতাপ শ্বশুর হরবল্লভের চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় যোগ করেছিল আলাদা মাত্রা। এমনকি হিন্দি ছবিতেও নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত ‘বাবুর্চি( যেটি তপন সিংহর’গল্প হলেও সত্যি’ র হিন্দি রিমেক) ছবিতে মেজ ভাইয়ের চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় অনবদ্য। আবার তরুণ মজুমদারের ‘দাদার কীর্তি’-তে সরস্বতী-বীণা র স্নেহশীল পিতার চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় মুগ্ধ করেছে দর্শকদের। এহেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসে ভোগ করেছেন কষ্ট। তাঁর হাতে বিশেষ কাজ অবধি ছিল না। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আরো একবার বাংলা ছবিতে, বলা ভালো তথাকথিত বাণিজ্যিক মেলোড্রামায় ভরা ছবির হাত ধরে দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেন পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। প্রসঙ্গত অঞ্জন চৌধুরীর ‘গুরুদক্ষিণা’ ছবিতে প্রথমে গুরুর চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। সেই সময় কাজ পাওয়ার আশায় তার সঙ্গে দেখা করতে অঞ্জনবাবুর বাড়িতে এসেছিলেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাঁকে দেখা মাত্রই গুরুর চরিত্রে তাঁকেই মনোনীত করেন অঞ্জন চৌধুরী। অঞ্জন চৌধুরী ছবির প্রযোজক ভবেশ কুন্ডুকে বলেন, “তোকে আর গুরু খুঁজতে হবে না।আমি গুরু পেয়ে গিয়েছি। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে গুরু সাজতে হতো, কিন্তু কালী বন্দ্যোপাধ্যায় গুরু সেজেই বসে আছেন।” ‘গুরুদক্ষিণা’র হাত ধরে অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে এক অন্য পথচলার শুরু কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর তাতেই পরে যুক্ত হয় ‘ছোট ব‌উ’, ‘ বিধিলিপি’, ‘অভাগিনী’, ‘মেজ বৌ’ এর মতো ছবি। অঞ্জন চৌধুরী র লেখা সংলাপ ও সমস্ত ছবিগুলিতে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিনয় দক্ষতায় দাগ কেটে যায় দর্শকহৃদয়ে। ‘ছোট ব‌উ’ ছবিতে অন্ধ শ্বশুরের চরিত্রে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের বলা সংলাপ ‘ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য মেশিন না বসিয়ে তোর মায়ের বুকে পেশমেকার মেশিনটা বসা। তা নাহলে তোর মা তো চিরকালের মতো ঠান্ডা হয়ে যাবে’.. রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে আমজনতার হৃদয়ে। ভিন্নধর্মী হোক বা বাণিজ্যিক কিংবা মেলোড্রামায় ভরপুর সবধরণের চরিত্রেই তিনি যে অনন্য সেটা তিনি বারংবার প্রমাণ করেছেন নিজের অভিনয় দিয়ে। আর তাইতো মাস হোক ক্লাস সব ধরণের দর্শকদের মনের মণিকোঠায় নিজের একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরেও এহেন একজন অনন্য অভিনেতা পাননি কোনো স্বীকৃতি। না রাজ্য সরকারের, না জাতীয় স্তরে কোনো পুরষ্কার পাননি তিনি। এমনকি শেষদিকে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গেও তাই বেশ দূরত্ব তৈরি হয়েছিল কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বলা ভালো নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তবে তার মধ্যেও ভালো কাজ করার খিদে থাকার কারণেই কাজ করেছেন অপর্ণা সেনের ছবি ‘ সতী’তে। শেষে ‘ তান্ত্রিক’ ছবির জন্য বৃষ্টিতে ভেজার জন্য নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৯৩সালের ৫জুলাই ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মতো একজন সৃজনশীল অভিনেতার শেষযাত্রায় সেভাবে কিছুই দেখা যায়নি সরকারি তরফে। বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের চালচিত্রটিকে নিজেদের নান্দনিকতা, অভিনয় প্রতিভায় যাঁরা সমৃদ্ধ করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম কালী বন্দ্যোপাধ্যায়। আজীবন বামপন্থী ভাবাদর্শে দীক্ষিত এই অভিনেতার জন্মশতবর্ষ চলে গেল নিঃশব্দেই। অথচ তাঁর মতো অভিনেতার এটা বোধহয় প্রাপ্য ছিল না। টালিগঞ্জ যেন কোথাও গিয়ে বাংলা ছবির এই অনন্য অভিনেতাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দিলেও আজীবন তিনি তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে রয়ে যাবেন মানুষের মনে। নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবীতে যতদিন বাংলা চলচ্চিত্র ও বাঙালি থাকবে ততদিন রয়ে যাবে কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। তিনি যে দর্শকদের মনে অভিনয়ের ভেলকি দেখিয়ে তাকে লাগিয়ে দেওয়া বাদশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *