ব্লেক এমন একজন ব্যক্তি -যার আগমন তার পূর্বসূরীরা অনুমান করতে পারেনি, যাকে তার সমসাময়িকদের সাথে এক কাতারে দাঁড় করানো যায় না এবং যাকে কোন উত্তরসূরী দিয়ে কোনদিন প্রতিস্থাপিত করা যাবে না

ব্লেক এমন একজন ব্যক্তি -যার আগমন তার পূর্বসূরীরা অনুমান করতে পারেনি, যাকে তার সমসাময়িকদের সাথে এক কাতারে দাঁড় করানো যায় না এবং যাকে কোন উত্তরসূরী দিয়ে কোনদিন প্রতিস্থাপিত করা যাবে না

✍️রামিজ আলি আহমেদ

উইলিয়াম ব্লেক

আজ ইংরেজ কবি, চিত্রশিল্পী এবং খোদাইশিল্পী,রোমান্টিক যুগ এর অগ্রদূত উইলিয়াম ব্লেক-এর মৃত্যদিন।১৮২৭ সালের এই দিনে তিনি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।তাঁর জন্ম হয়েছিল ২৮শে নভেম্বর, ১৭৫৭ সালে লন্ডনের সোহোতে গোল্ডেন স্কয়ারের ২৮ নম্বর ব্রড স্ট্রিটে বর্তমানে যেটি ব্রডউইক স্ট্রিট।তাঁর বাবা জেমস ব্লেক ছিলেন কাপড়ের ব্যবসায়ী।আর মা ক্যাথেরিন রাইট আর্মেটেজ ব্লেক তাঁদের সাতবোনের দেখাশোনা করতেন।ব্লেক দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে দুজন শৈশবেই মারা যায়।উইলিয়াম ব্লেক শুধু লেখা আর পড়াটা শিখতে যতদিন লাগে ততদিনই স্কুলে গিয়েছিলেন।১০বছর বয়সে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন।বাকি শিক্ষলাভ করেছিলেন মায়ের কাছেই।

সুযোগ পেলেই তিনি লন্ডনের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। গভীর আগ্রহে চারপাশ অবলোকন করতেন। বাবার কিনে দেয়া বইগুলো থেকে প্রাচীন গ্রিক চিত্রকর্মগুলো খোদাই করার চেষ্টা করতেন। এসব চিত্রকর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়েই রাফায়েল, মাইকেলেঞ্জেলো, হিমস্কার্ক, ডিউরার প্রমুখের কাজে তিনি প্রভাবিত হন।

এ সময় কবিতার প্রতিও ধীরে ধীরে তার আকর্ষণ জেগে ওঠে। চিত্রকর্মের প্রতি ব্লেকের অনুরাগের কারণে বাবা-মা তাকে দশ বছর বয়সে একটি ড্রয়িং একাডেমিতে এবং পরবর্তী সময়ে তরুণ শিল্পীদের একটি প্রিপারেটরি স্কুলে ভর্তি করে দেন।

ব্লেকের শৈশব শান্ত ও সুখদায়ক ছিল, কিন্তু আট বছর বয়স থেকে তিনি বিভিন্ন কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে শুরু করেন। যেমন, গাছের ডালে দেবদূত দেখা বা ডানা গজানো তারকা।

এসবই আসলে তার অতি কল্পনাপ্রবণ মনের চাঞ্চল্য ছিল। এ দৃশ্যপট কল্পনাক্ষম মন তার কাব্যচর্চার ক্ষেত্রে তাকে দিয়েছিল আলাদা সুবিধা। ব্লেকের কবিতাগুলো পড়তে গেলে পাঠকের মনে হবে, তারা কোনো খোদাই করা দৃশ্য দেখছেন। কাব্যে চিত্রাঙ্কনের এ অসাধারণ ক্ষমতা ব্লেককে তার সমসাময়িকদের মধ্যে করেছে অনন্য।

১৭৮২ সালে ব্লেক স্থানীয় এক মুদি দোকানির মেয়ে ক্যাথেরিন বাউচারের সঙ্গে পরিচিত হন। এ পরিচয় পরবর্তী সময়ে প্রণয় ও পরিণয়ে গড়ায়। ১৭৮৩ সালে ব্লেক তার প্রথম কবিতার সংকলন ‘পোয়েটিক্যাল স্কেচেস’ প্রকাশ করেন। কাব্যে খুব একটা কাটতি না হলেও খোদাইকারী হিসেবে ব্লেকের খ্যাতির কারণে তাদের সংসার চলে যাচ্ছিল।

১৭৯৫ সালে ব্লেক ‘লার্জ কালার প্রিন্টস’ নামে একটি সিরিজ শুরু করেন। বাইবেল, মিল্টন ও শেকসপিয়ার থেকে বিষয়বস্তু নিয়ে তিনি এ সিরিজ চালিয়ে যান। ব্লেক সে বছরই টমাস বাটস নামে একজন পৃষ্ঠপোষক পেয়ে যান।

অর্থাৎ বাটসের অর্থায়নে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্লেক বেশ কয়েক বছর ধরে তার জন্য ছবি আঁকেন। এখানে ব্লেক আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি শিল্পে অবারিত স্বাধীনতাও ভোগ করেন। তিনি তার কল্পনায় রং লাগিয়ে তুলিতে যা-ই ফুটিয়ে তুলতেন, বাটস তা-ই কিনতেন। ব্লেকের ভাষ্যমতে, তিনি যে কোনো সময়ের চেয়ে এখানে কাজ করার সময় আরও অনেক ভালো কাল্পনিক দৃশ্য দেখতে পেতেন।

ব্লেকের অলীক দর্শন বা হ্যালুসিনেশন তাকে সাধারণের কাছে পাগল পরিগণিত করতে থাকে। পরিণত সময়েও তিনি প্রায়ই দাবি করতেন, তার কাজগুলো দেবদূতদের দ্বারা প্রভাবিত। অনেক সময় কুমারী মেরির মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয় বলেও তিনি দাবি করতেন।

১৮২৭ সালে ব্লেক জন লিনেল নামে এক তরুণ শিল্পীর পৃষ্ঠপোষকতায় দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ সিরিজের খোদাইয়ের কাজ করছিলেন। এ কাজ অসমাপ্ত রেখেই সে বছর ১২ আগস্ট ব্লেক পরলোকগমন করেন।

মৃত্যুবরণের দিনও নিরন্তর কাজ করে গেছেন। মৃত্যুর আগে স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে ভোলেননি ব্লেক। স্ত্রীর ছবিটি এঁকে তিনি তার যন্ত্রপাতি নামিয়ে রাখেন। তারপরই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জীবদ্দশায় যথেষ্ট স্বীকৃতি না পেলেও বর্তমানে তাকে রোমান্টিক যুগের কবিতা এবং চিত্রশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন বিবেচনা করা হয়। তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কবিতাগুলো যতটা মেধার স্বাক্ষর বহন করে সে তুলনায় ইংরেজি সাহিত্যে তার কবিতা সবচেয়ে কম পঠিত হয়েছে।তাঁর আঁকা ছবি এতোই চিন্তা উদ্দীপক ছিল যে একজন সমসাময়িক শিল্প সমালোচক তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, “ব্রিটেন যত
শিল্পীর জন্ম হয়েছে তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবার সেরা এবং অন্য যে কারও চেয়ে অনেক এগিয়ে তিনি”।তিন বছর ফেল্পহ্যামে থাকাটা বাদ দিলে জীবনের পুরোটা সময়ই লন্ডনে কাটিয়েছেন। কিন্তু তার কর্ম এতো বৈচিত্র্যময় ও রূপকাশ্রিত যে মনে হয় তিনি যেন “ঈশ্বরের সর্বস্ব” বা “গোটা মানব অস্তিত্ব” কল্পনায় ধারণ করতেন।খেয়ালি মেজাজ ও অনন্য দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সমসাময়িকদের অনেকে তাঁকে পাগল ভাবতেন। কিন্তু পরবর্তী যুগের সমালোচকরা তাঁর প্রকাশভঙ্গী ও সৃজনশীলতা এবং তার লেখা ও ছবির দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক অন্তঃসার দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তার ছবি ও কবিতাকে রোমান্টিক বা প্রাক-রোমান্টিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, কারণ তার মূল প্রকাশ অষ্টাদশ শতকে। বাইবেলের প্রতি ভক্তি থাকলেও ব্লেক চার্চ অফ ইংল্যান্ডের প্রতি ক্ষিপ্ত ছিলেন, আসলে সকল ধরনের সংগঠিত ধর্মের প্রতিই তাঁর ক্ষোভ ছিল। তিনি ফরাসি বিপ্লব এবং মার্কিন বিপ্লবের আদর্শ ও উচ্চাভিলাস এবং Jakob Böhme ও Emanuel Swedenborg এর মত চিন্তাবিদদের দ্বারা অণুপ্রাণিত হয়েছিলেন।এঁদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও তাঁর কর্মের অনন্যতা তাঁকে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণীর মাঝে ফেলতে দেয় না। ঊনবিংশ শতকের পণ্ডিত উইলিয়াম রোজেটি তাকে ‘glorious luminary’ (প্রসিদ্ধ জ্যোতিষ্ক) বলেছিলেন এবং তাঁর মতে ব্লেক এমন একজন ব্যক্তি -যার আগমন তার পূর্বসূরীরা অনুমান করতে পারেনি, যাকে তার সমসাময়িকদের সাথে এক কাতারে দাঁড় করানো যায় না এবং যাকে কোন উত্তরসূরী দিয়ে কোনদিন প্রতিস্থাপিত করা যাবে না।

এক নজরে ব্লেক:

জন্ম:

২৮ নভেম্বর ১৭৫৭
সোহো, লন্ডন, গ্রেট ব্রিটেন

মৃত্যু :

১২ আগস্ট ১৮২৭ (বয়স ৬৯)
চেয়ারিং ক্রস, লন্ডন, গ্রেট ব্রিটেন

পেশা :

কবি, চিত্রশিল্পী, মুদ্রক

ধরণ :

দর্শন, কাব্য
সাহিত্য আন্দোলন
রোমান্টিকতা

উল্লেখযোগ্য রচনাবলি :

Songs of Innocence and of Experience, The Marriage of Heaven and Hell, The Four Zoas, Jerusalem, Milton, And did those feet in ancient time

স্ত্রী :

ক্যাথরিন বাউচার

(১৭৮২–১৮২৭, উইলিয়ামের মৃত্যু অবধি)

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *