google-site-verification=3aWTtnJLDmziNXnTRHYjTuuhcCjdWHLf0r3nb02M4_Q তিনি নায়ক নন... তিনি অভিনেতা google-site-verification=3aWTtnJLDmziNXnTRHYjTuuhcCjdWHLf0r3nb02M4_Q
Anando Sangbad Live

তিনি নায়ক নন… তিনি অভিনেতা

✍️ সোমনাথ লাহা

[ নায়কোচিত চেহারা ছিল না তাঁর, কিন্তু সেলুলয়েডে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন আমাদের চেনা সমাজের জীবন্ত চরিত্র। আর সেই সব চরিত্রদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে জুড়ি মেলা ভার ছিল তাঁর। নব্ব‌ইতেই ইহজগতের থেকে প্রস্থান করলেন মনু মুখোপাধ্যায়।]

‘তুমি কাশী যেতে পারো, যেতে পারো গয়া.. পাবে না এমন অপয়া..’। ‘পাতালঘর’ ছবিতে গোবিন্দ ‘অপয়া’ রূপী মনু মুখোপাধ্যায়ের লিপে এই গানটি ভুলে যাননি সিনেপ্রেমী দর্শকরা। ভোলার কথাও নয়। আসলে ছবির পর্দায় অপয়া চরিত্রে অভিনয় করলেও বাস্তবে চলচ্চিত্রের অঙ্গনে তিনি ছিলেন পয়া অভিনেতা। বাংলা ছবির স্বর্ণযুগের অন্যতম কারিগর। যাঁরা একটি একটি করে সেই সুবর্ণ সময়ের চালচিত্র গড়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন মনু মুখোপাধ্যায়। নায়কোচিত চেহারা না হয়েও যিনি ছিলেন পারিপার্শ্বিক চেনা সমাজের জীবন্ত প্রতিনিধি। অচিরেই পর্দায় হয়ে উঠেছিলেন জ্যান্ত চরিত্র। অবশেষে নব্ব‌ইয়ের কোঠায় এসে চিরতরে থেমে গেলেন তিনি। মনু মুখোপাধ্যায়ের ইহজগত ত্যাগের সঙ্গে সঙ্গেই থেমে হারিয়ে গেল এক অধ্যায়। যেটির সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ছিল টালিগঞ্জের স্বর্ণযুগের বহু স্মৃতিমাখা বেলা। মূলত মঞ্চের হাত ধরেই অভিনয়ে প্রবেশ মনু মুখোপাধ্যায়ের। শুরুটা করেছিলেন প্রম্পটার হিসেবে বিশ্বরূপায়। একদা টালার বাসিন্দা মনু মুখোপাধ্যায় একসময় হাইকোর্টের কেরানির কাজ‌ও করেছেন। প্রম্পটার থেকেই ধীরে ধীরে তিনি পা বাড়ান মঞ্চের পথে। ‘ক্ষুধা’ নাটকের হাত ধরেই তাঁর মঞ্চাভিনয়ের সুত্রপাত। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মনু মুখোপাধ্যায়কে। পরবর্তী সময়ে মিনার্ভায় নিয়মিত থিয়েটার করতেন তিনি। ১৯৫৯-এ মৃণাল সেন পরিচালিত ‘নীল আকাশের নিচে’ ছবির হাত ধরে চলচ্চিত্রের আঙিনায় পা রাখেন মনু মুখোপাধ্যায়। তারপর আর থামা নেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত চরিত্রাভিনেতা হিসাবে বড়পর্দায় একের পর এক নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন মনু মুখোপাধ্যায়। মৃণাল সেনের পাশাপাশি কাজ করেছেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও। সত্যজিতের ছবিতে তাঁর কাজের সূচনা হয় ‘অশনি সংকেত’ -এর হাত ধরে। সেই ছবিতে একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন মনু মুখোপাধ্যায়। আর তারপরেই সত্যজিৎ রায়ের ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ এর সৌজন্যে তাঁর হাতে এসে পড়ে এক আইকনিক চরিত্র ‘মছলিবাবা’। কাশীর গঙ্গার ঘাটে বসা এমন এক সাধু( যিনি একাধারে ভন্ড), যে তার প্রিয় ভক্তদের একটি করে মন্ত্রপুত মাছের শল্ক তথা আঁশ দেন। মূলত তাঁর দাড়িওয়ালা মুখের সঙ্গে ফেলুদারূপী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের দাড়িওয়ালা মুখের মিল থাকার জন্য এই চরিত্রটিতে মনু মুখোপাধ্যায়কে বেছে নিয়েছিলেন সত্যজিৎ। এমনকি প্রথম দিন সত্যজিতের নির্দেশ মতো প্রায় দেড় ঘণ্টা মেক আপ আর্টিস্টের মেকআপ গুণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মছলিবাবা। পর্দায় দক্ষতার সঙ্গে চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন মনু মুখোপাধ্যায়। কিন্তু এমন একটি অসাধারণ চরিত্রে অভিনয়ের পরেও সেভাবে প্রচারের আলো তাঁর গায়ে এসে পড়েনি। পরবর্তীতে আবার সত্যজিতের আরেকটি ছবি ‘গণশত্রু’ তে কাজ করেন মনু মুখোপাধ্যায়। মৃণাল-সত্যজিৎ ছাড়াও তরুণ মজুমদারের একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। সেই তালিকায় রয়েছে ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’, ‘গণদেবতা’, ‘দাদার কীর্তি’, ‘মেঘমুক্তি’, ‘খেলার পুতুল’-এর মতো ছবি। এছাড়াও বিজয় বসুর ‘সাহেব’, প্রভাত রায়ের ‘ প্রতিদান’, ‘শ্বেত পাথরের থালা’-র মতো ছবিতেও তাঁর অভিনয় দাগ কেটে গিয়েছে। তবু থেমে থাকেননি তিনি। রাজা সেনের ‘দামু’, ‘দেশ’ -র মতো ছবিতে, এমনকি শতরূপা সান্যালের ‘অনু’ তে ছোট চরিত্রেও তিনি যেন সেই রক্তমাংসের জীবন্ত মানুষ।ভোলা যায় না ‘পাতালঘর’ ছবিতে গোবিন্দ’অপয়া’ বিশ্বাসের চরিত্রে তাঁর প্রাণঢালা অভিনয়। একেবারে জীবনের দ্বারপ্রান্তে এসেও নিজের অভিনয় প্রতিভার ঝলক দেখিয়েছেন প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর ‘বাকিটা ব্যাক্তিগত’ ও সায়ন্তন ঘোষালের ‘আলিনগরের গোলোকধাঁধা’-র মতো ছবিতে। বড়পর্দার পাশাপাশি ছোটপর্দায় তথা টেলিভিশনে বহু উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন মনু মুখোপাধ্যায়। জি বাংলার ‘বয়েই গেল’ মেগা ধারাবাহিকে ঘটি বাড়ির কর্তারা চরিত্রে তাঁর প্রাণঢালা অভিনয় বহুদিন মনে থেকে যাবে দর্শকদের। তাইতো মনু মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ফেসবুক পেজে পরিচালক অতনু ঘোষ স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, “ক্যামেরার সামনে অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্য, নিঁখুত মাত্রাজ্ঞান, দুরন্ত রসবোধ, কাজের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা’। আর সত্যি বলতে এগুলোই তাঁকে জায়গা করে দিয়েছে দর্শকমহলে। আসলে তাঁর মধ্যে ছিল অভিনয়ের শখ। সেটা পূরণ হ‌ওয়াটাই ছিল মনু মুখোপাধ্যায়ের কাছে বড় প্রাপ্তি। তাই পার্শ্বচরিত্র বা চরিত্রাভিনয়ে তিনি আনন্দের সঙ্গে কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর কথায় ‘ আমি অভিনেতা হতে পেরেছি, এটাই অনেক’। কিন্তু তারপরেও দুর্ভাগ্য এটাই যে মনু মুখোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতার‌ও যথাযোগ্য মূল্যায়ন হয়নি।২০১৫-তে টেলিসন্মান পুরষ্কারের অনুষ্ঠানে লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্টের পুরষ্কার তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে। জীবনের শেষদিকে তাই বাংলা ছবির জগতের থেকে একপ্রকার নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তবে দীর্ঘ লকডাউনে গৃহবন্দী অবস্থাতেই দেখে ফেলেছিলেন বাংলা ছবির ভবিষ্যতের রেখাচিত্রকে।একের পর এক সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমাহল যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শক্ত হাতে হাল ধরতে না পারলে যে ঘনিয়ে আসছে আঁধার, তা বুঝেই বোধহয় জীবনের যবনিকা টেনে চলে গেলেন মনু মুখোপাধ্যায়। আর তাঁর সঙ্গে সঙ্গেই যেন বিলীন হয়ে গেল চেনা সমাজের জীবন্ত চরিত্রর প্রতিচ্ছবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *