Anando Sangbad Live

টেলিমেডিসিন – চিকিৎসা ব্যবস্থাকে করে তুলেছে সহজতর

✍️ডাঃ শুভ্রজ্যোতি ভৌমিক(ক্রিটিক্যাল ট্রায়াল স্পেশালিস্ট এন্ড ক্লিনিক্যাল ফার্মাকলজিস্টডিরেক্টর,ক্লিনিক্যাল রিসার্চপিয়ারলেস হাসপাতাল,কলকাতা) ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন –এর মতানুযায়ী টেলিমেডিসিন হল এমন একটি পদ্ধতি যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা পাওয়া খুবই দুর্লভ সেই সকল অঞ্চলে তথ্য –প্রযুক্তি ব্যাবস্থার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেই সকল তথ্যের আদান-প্রদান করা, যার দ্বারা রোগ নির্ণয়, রোগীর চিকিৎসা ,রোগ এবং জখম নিরাময় ইত্যাদির সব কিছুর পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা, এছাড়াও, বিভিন্ন পরীক্ষক এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের মূল্যায়ণ এবং শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা। এই পদ্ধতির একমাত্র অন্যতম লক্ষ্য হল প্রত্যেক মানব তথা সম্পূর্ণ মানবজাতির চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘটানো। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণদপ্তর দপ্তরের পক্ষ থেকে, ২০২০ সালের ২৫শেমার্চ “টেলিমেডিসিন পদ্ধতি অনুশীলন করার বিভিন্ন নিয়মাবলী,২০২০” প্রকাশিত করে যা ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল আক্ট,১৯৫৬-এর অধীনে প্রযোজ্য।তবে, এই নিয়মাবলীর অধীন থেকে বর্জিত থাকবে ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল কাউন্সিল (কর্মদক্ষক, পরিচালন ব্যবস্থা, শিষ্টাচার এবং নীতি শাস্ত্র নিয়মাবলী,২০০২)। টেলিমেডিসিনের উদ্দেশ্য সকলের কাছে চিকিৎসা ব্যবস্থার সমবন্টন। উপরোক্ত নিয়মাবলী প্রযোজ্য হবে রেজিস্টার্ড মেডিকেল প্রাক্টিশনারস (RMP)-দের উপর, ১৯৫৬-এর আইনঅনুযায়ী।উল্লিখিত নিয়মাবলী অনুযায়ী কর্মরত চিকিৎসকেরা টেলিমেডিসিন পদ্ধতির মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসা করতে পারবে। টিমেডিসিনে পদ্ধতিতে রোগীদের কাছে শব্দ, কথা, লেখনী বা ডিজিটাল যে কোনো উপায়ে তথ্য পাঠানো সম্ভব। ভারতে টেলিমেডিসিন পদ্ধতির শর্তানুযায়ী একজন কর্মরত চিকিৎসক তখনই এই পদ্ধতির ব্যবহার করতে পারবে,যখন তিনি যথেষ্ট দক্ষ হবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য যে রোগীকে সামনাসামনি পরিদর্শন জরুরি নাকি অনলাইনে পরামর্শদান যথেষ্ট। চিকিৎসককে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন তার চিকিৎসাই কোনো রকম খামতি না থাকে। টেলিমেডিসিন পদ্ধতি চালনার জন্য সাতটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে লক্ষ্য রাখা জরুরি, যথা -প্রসঙ্গ, RMP এবং রোগীর সনাক্তকরণ, জ্ঞাপনের মাধ্যম, সম্মতি, পরামর্শদানের প্রকারভেদ, রোগীর মূল্যায়ন এবং রোগীর পরিচালনা। টেলিমেডিসিনের দ্বারা RMP অর্থাৎ চিকিৎসক এবং রোগীর মধ্যে পরামর্শ প্রদানের জন্য প্রয়োজন প্রথমত ,রোগীর সনাক্তকরণ এবং সম্মতি, দ্বিতীয়ত, দ্রুত রোগ নির্ণয়, তৃতীয়ত, রোগীর মূল্যায়ন এবং সর্বশেষে রোগীর সুষম পরিচালনা। একজন RMP টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে পরামর্শ প্রদানের জন্য যেকোনো প্রকারের মাধ্যম অর্থাৎ টেলিফোন, ভিডিও, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল, বিভিন্ন চ্যাটিং এপ্লিকেশন যথা- হোয়াটস্যাপ, ফেসবুক, মেসেঞ্জার ইত্যাদির ব্যবহার করতে পারে। এছাড়াও, টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে তথ্যপ্রদানের জন্য ইমেল, স্কাইপ, ফ্যাক্স ইত্যাদি এপ্লিকেশন ও ব্যবহার করা যেতে পারে। টেলিমেডিসিন পদ্ধতি, জ্ঞাপনের মাধ্যম অনুযায়ী বা তথ্যজ্ঞাপনের সময় অনুসারে, চিকিৎসক-রোগী অথবা চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মী বা এক চিকিৎসকের সাথে অন্য চিকিৎসকের পরামর্শদান অনুসারে মোট চারপ্রকারের হয়ে থাকে।টেলিমেডিসিন পদ্ধতির জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রযুক্তির ব্যবহার হয়ে থাকতে পারে।এদের মধ্যে ভিডিও, অডিও এবং টেক্সট (চ্যাট, ইমেল, মেসেজ, ফ্যাক্স ইত্যাদি ) অন্যতম। এইসকল প্রযুক্তির প্রত্যেকটির নিজস্সো সুবিধা, অসুবিধা এবং প্রসঙ্গ আছে, যার জন্য অনেক সময়ই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শদান পর্যাপ্ত এবং অপর্যাপ্ত উভয়ই হতে পারে। সেইজন্য প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এইসকল প্রযুক্তির উপকারিতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত থাকা উচিত। যদিও টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে পরামর্শদান RMP-দের বিভিন্ন সংক্রামক অবস্থার থেকে রক্ষা করতে পারে, তবুও এটি কখনোই শারীরিক উপস্থিতির দ্বারা পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসার পদ্ধতিকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে না, যেখানে স্পর্শ এবং অনুভব করা অত্যাবশ্যক।নতুন প্রযুক্তির ব্যবস্থার এইসকল খামতির উন্নতিসাধনের প্রচেষ্টা করা উচিত। টেলিমেডিসিনের ভিডিও প্রণালী যেমন- বিভিন্ন এপ্লিকেশনে ভিডিও চ্যাট, ফেসটাইম, ইত্যাদি রোগীকে পরামর্শদানের জন্য সবচেয়ে কার্যকরী উপায়। তবে, এই পদ্ধতির থেকে সম্মুখে রোগীকে পরীক্ষা করে পরামর্শ দেওয়া RMP-দের জন্য বেশি সহজতর। ভিডিও প্রণালীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধ তা হল উভয়পক্ষের ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা। এছাড়াও, ভিডিও প্রণালীতে রোগীর গোপনীয়তা বজায় রাখা একটি অতি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। ফোনে অডিও প্রণালী অর্থাৎ – ভি.ও.আই.পি, বিভিন্ন এপ্লিকেশনের দ্বারা পরামর্শদান যদিও অতি সহজলভ্য এবং কিছুক্ষেত্রে উপযুক্ত তবুও, যে সকল ক্ষেত্রে চাক্ষুষ পরিদর্শন প্রয়োজন যেমন-ত্বক, চোখ, জিভ ইত্যাদির পরীক্ষার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অনুপযুক্ত। টেক্সট–প্রযুক্তি ব্যবস্থা বলতে বোঝায় বিশেষত চ্যাট সংক্রান্ত ব্যবস্থা।স্মার্টফোনে অথবা কোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইসের বিভিন্ন এপ্লিকেশন যেমন-হোয়াটস্যাপ, গুগল হ্যাংআউটস, ফেসবুক মেসেঞ্জার অথবা এস.এম.এস –ইত্যাদির মাধ্যমে সুবিধাজনক ভাবে এবং অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে পরামর্শদান সম্ভব।তবে সনাক্তকরণ এবং ডকুমেন্টেশন এই প্রণালীর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।কোনো জরুরি অবস্থায় তৎক্ষণাৎ পরামর্শপ্রদান এই পদ্ধতির মাধ্যমে করা সম্ভব। চাক্ষুষ পরিদর্শন এবং শারীরিক স্পর্শ ছাড়া ও এই প্রণালীর আরেকটি বোরো সীমাবদ্ধতা হলো মৌখিক সংকেতের অনুপস্থিতি।যার ফলে রোগীর চিকিৎসকের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে উঠতে অনেকাংশেই বাধা পেতে পারে। ASYNCHRO-NOUS-প্রণালীর অর্থাৎ ইমেইল, ফ্যাক্স ইত্যাদির সবচেয়ে বোরো সুবিধা হল কোনো বিশেষ নির্দিষ্ট এপ্লিকেশন ছাড়াইসহজলভ্য ,ছবি, রিপোর্ট, তথ্য ইত্যাদিও সহজেই ডাউনলোড এবং শেয়ার করা সম্ভব।কোনো দ্বিতীয় পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে এই প্রণালীবেশ উপযোগী। কিন্তু এই প্রণালীর সীমাবদ্ধতা হল তৎক্ষণাৎ জ্ঞাপন সম্ভব নয়। এবং শুধুমাত্র একমুখী প্রসঙ্গই উপস্থিত থাকে। এছাড়াও, এই প্রণালীতে রোগীর সনাক্তকরণ শুধুমাত্র ডকুমেন্টের উপর নির্ভর করেই সম্ভব এছাড়াও, RMP-রা ইমেল অবিলম্বেনাও দেখে থাকতে পারে। টেলিমেডিসিনের সকল সুবিধাগুলির মধ্যে বিশেষ হল- কম খরচে রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা দ্রুত এবং সহজেই গ্রহণ করতে পারে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে এই পদ্ধতির সুবিধা হল – বিশেষ ঝামেলা ব্যতীত বাড়তি আয় সম্ভব এবং রোগ ছড়ানোর ভয়ও কম থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *