কোলকাতাকে খোলা চিঠি বাংলাদেশের অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতির

কোলকাতাকে খোলা চিঠি বাংলাদেশের অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতির
জ্যোতিকা জ্যোতি

প্রিয় কোলকাতা,
কেমন আছো?
মনের ভেতর তোমার অলিগলি,আর তোমার অলিগলিতে মন! সেই গলিদের গল্প, সেই গল্পের মানুষেরা, সেই মানুষদের জীবন, সেই জীবন যাপনের কোলাজ আচ্ছন্ন করে রেখেছে আমায়। কাঁটাতারের এপারে থেকে ওপারে যাবার তীব্র টান রক্তাক্তই করে কেবল, পেরুনো যায়না !
প্রিয় শহর,
তোমার প্রাচীন দেয়ালের ছায়া পড়া শান্ত রাজপথ, ঝাঁ চকচকে রোদ বা টুপটাপ বৃষ্টিতে সবুজ গাছের ছায়ায় হলুদ ট্যাক্সিদের জিরনো, রবীন্দ্র সরোবরের পদ্মপুকুর-ছোট্ট দ্বীপমতো জায়গাটার পাতাহীন গাছে কাকেদের মেলা, চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা কাঠবেড়ালী, জলেভেজা হাওয়া, বয়েসী বন্ধুদের মশগুল আড্ডা, বৃষ্টিতে ডুবে যাওয়া থিয়েটার রোড আর হরিপদ দত্ত লেনের সরু গলি, সরোজিনী নাইড়ু স্মরণীর সবুজ সাইনবোর্ড, নন্দনের কলরব, ভিক্টোরিয়ার ঘোড়ার গাড়ী, কিউপি’স এর দুপুর, টুপটাপ রসগোল্লা, অক্সফোর্ডের সাজানো বইয়ের তাক আর জেসমিন টি, নিউমার্কেটের অমানবিক রিকশা, অলি গলির উপরে কাঁচা বাজারের সকাল, জল-ফুল বেচাকেনার হল্লা আর ভাড়ে চায়ের স্মৃতির ভার…আমায় কুঁজো করছে!
প্রিয় প্রাচীন,
আমাকে পেরিয়ে ধীরে ধীরে চলে যাওয়া ট্রামের বৈদ্যুতিক তারের শেষ বিন্দু পর্যন্ত দেখিনা কতদিন।তুমি যানো,কেন আমি আজো উঠতে পারিনি ঘোরগ্রস্থ ট্রামে! অবচেতনে আমার চোখের সামনের ট্রাম লাইনে জীবনানন্দর আনমনে হেঁটে যাওয়া আমাকে ট্রামে উঠতে দেয়না!
নস্টালজিক শহর, তোমার পথ ধরে আরো দুজন আমার সাথে ঘুরে বেড়ায়, সে আমার দাদু-দিদিমা।দাদু,আমার অন্ধকার ছোট্টবেলার জ্ঞানের আলোকবাটি আর দিদিমা সকল আবদারের আধার! আমাদের রংহীন কৈশোরের একমাত্র রংতুলি এই দুজন জীবনের সকল চাওয়া পাওয়া কিশোরগন্জের কালীগঙায় ভাসিয়ে দিয়ে ২৫বছর আগে পাড়ি জমিয়েছিলো তোমার গঙাপাড়ে।বরানগর ঘাটের গঙার জলেই ভেসে গেছে তাদের পোড়খাওয়া মন আর শরীরের ছাই।আমাদের সাথে আর দেখা নাই।অবচেতনে তারা হাঁটে তোমার পথে পথে আমার সাথে।
স্নিগ্ধ শহর,
তোমার সবুজে ঘেরা আমার রিজেন্ট এস্টেটের বাড়ী ঝড়ে বিধ্বস্ত কি?আমার আর্ধেক সেখানে রাখা আছে।যশোর রোড, অজয়নগরের খবর জানি মামী মাসির সুবাদে, কৃঞ্চনগরের খবরও আছে।সিনেমা, থিয়েটার,পত্রিকা, টেলিভিশন, ব্যাবসা বানিজ্যও কিছুটা জানি বিজ্ঞান আর বন্ধুদের কল্যানে।এসআরএফটিআইয়ের সবুজ ক্যাম্পাস আর গাছেরা আম্পান তান্ডবের পর অক্ষত আছে তো? তোমার মুদির দোকানী, তরকারীওয়ালা, ড্রাইভার, ফুলওয়ালা,শমিংমল, সিনেমাহল, পেস্ট্রিশপের লোকেরা কিংবা চেনা মানুষদের কেউ কেউ একটু রুঢ়তায় অভ্যস্ত হলেও আমার নরোম বাংলাদেশী মন এতদিনে তাদের বুঝে গিয়ে মানিয়ে নিয়েছে।এই করোনাকালে সেই মানুষগুলো সব ভালো আছে তো?দক্ষিণাপন, গড়িয়াহাট,কালীঘাটের হকার্সরা? ঢাকা কালীবাড়ীর বটগাছতলা বৃষ্টির জলে ডুবে আছে কি? নীলসাদা উড়ালসেতুর ল্যাম্পপোস্টগুলো? রাজলক্ষ্মীর রাজারহাটের ফ্ল্যাটের সেই অদ্ভুত সুন্দর সুবিশাল ছাদটাকেও মনে পড়ে ভীষন।এখনতো আর সেই ছাদে উড়াজাহাজের উড়োউড়ি নেই নিশ্চই।আর থাকলেতো কবেই উড়ে চলে আসতাম!

প্রিয় আনন্দনগরী,
তুমিবিচ্ছিন্ন এই লকডাউন আমায় লকআপে রেখেছে যেন।কবে গঙার ধারে যাবো,পোস্ত খাবো,কোন ফাঁকা ফুটপাতের ভাড়ে চা চাইই চাই, সন্ধ্যার পার্কস্ট্রীটে হাঁটবো,মামীর সাথে সিনেমা-শপিংয়ে যাবো, আর মমো’র কথা নাইবা বলি।বন্ধুদের সাথে আড্ডায় এদেশ ওদেশ খোঁচাখুঁচি ছাড়া আর ভাল্লাগছেনা।কতদিন দেখিনা আমার সহকর্মী আর বন্ধুদের মুখ! কাতর হয়ে আছি তোমার শান্ত অলিগলিতে একা একা নিজের সাথে কথা বলতে।
ঐতিহ্যের শহর, আমার সাথে তোমার ধরনই এমন।পরিচিত হওয়ার সাথে সাথেই মানুষগুলো তার পূর্বপুরুষদের ভিটে মাটির কথা জানতে চায়,তাদের চোখে চিকচিকে মায়া দেখতে পাই সেই বাংলার জন্য।এমন অনেক মায়াচ্ছন্ন গল্প শোনার পর আমার একা হতে হয়, নিজের সাথে কথা বলার জন্য।তোমার প্রাচীন কিছু বাড়ির প্রাচীর পেরিয়ে চার দেয়ালের গল্প জানা এখনো ঢের বাকী।
অপেক্ষায় আছি-দু’পা এগুলে চার রকম ভাষা কবে কানে বাজবে, নারী হিসেবে জড়োসড়ো জীবন থেকে ছুট্টি নিয়ে দাপিয়ে বেড়াবো তোমার বুকে, বিশ্রী গরমে ভিজে গেলে নাহয় শিবুজীর কুলফি খেয়ে নেবো,বারাসাত যাবো আদরের ছাদ বাগান আর নাচ দেখতে, হোলিতে রঙীন রাস্তাতো এবার মিস করবোই না,কার না ভালো লাগে রং মাখাতে? সিনেমা তো প্রতি সপ্তাহে দুটো দেখবোই,নাকি বদলে যাবে সিনারিও? অপেক্ষায় আছি আবার কোন নতুন রূপে আসবো তোমার রুপালী জমিনে! উফ কবে কবে কবে…
প্রিয় কোলকাতা,
ভালো থেকো।
অপেক্ষায় আছি
কবে ছোঁব স্বপ্নের কানামাছি!

ইতি,
তুমি যাকে রাজলক্ষ্মী বলে চেনো।
১২.০৬.২০২০
ঢাকা।

admin

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *