আমার চোখে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

0
117
✍️সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় অনুপ পান

উত্তম কুমারের মৃত্যুর সময় আমার জন্মই হয়নি। তাই ওনার প্রতি পার্সোনালি আমার ভালোলাগা বা ভালোবাসা সেভাবে জন্মই নেয় নি। (ক্ষমা করবেন)
কিন্তু আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি যে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো একজন ব্যক্তিত্বকে আমি সামনে থেকে দেখেছি, মিশেছি, ওনার সাথে একসাথে অনেকদিন কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ওনার সাথে আমার আলাপ ২০১৭ সাল থেকে।
আমার প্রথম ছবি “কোলকাতায় কোহিনূর”- এ কুড়ি দিন একসাথে কাজ করা, ডাবিং প্রমোশন সবকিছু মিলিয়ে অনেকদিন ওনাকে অনেক সামনে থেকে দেখেছি, মিশেছি। আমাদের ছবির প্রোডাকশন ম্যানেজার শম্ভুদা কে আমি বলেছিলাম সৌমিত্র জেঠুকে যে গাড়ি বাড়ি থেকে আনতে যাবে সেই গাড়িতে আমি যাবো। প্রতিদিনই ওনাকে আনতে যাওয়ার গাড়িতে আমি যেতাম, বাড়ি থেকে ওনাকে নিয়ে শুটিং ফ্লোরে আসতাম, যাতে করে একটু বেশি সময় ওনার সাথে কাটাতে পারি, ওনার কথা শুনতে পারি, ওনার থেকে কিছু শিখতে পারি ।প্রতিদিনই দেখতাম সময়ের নিয়মানুবর্তিতা ওনার থেকে কেমন করে শিখতে হয়। রোজ প্রথম দেখাতেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে জিজ্ঞাসা করতাম জেঠু শরীর কেমন আছে। আর উনি বলতেন “শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না বুঝলে”।
একদিন সাহস করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম _ এই বয়সে এত কাজ করো কেন? ওনার উত্তর ছিল- “কাজ করতে না পারলে বেঁচে থেকে লাভ কি ? যতদিন বেঁচে আছি ততদিন পর্যন্ত কাজ করে যেতে চায় “।শরীরের কারণে ওই সময়টাতে উনি চার ঘন্টার বেশি শুটিং করতেন না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে দেখেছি এমন অনেক দিন হয়েছে আমি ওনাকে রিকোয়েষ্ট করাতে উনি আরো একটু বেশি সময় শুটিং ফ্লোরে থেকে গেছেন। গাড়িতে যাওয়া-আসার পথে অনেক গল্প করতেন। আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওনার কথাগুলো শুনতাম। আমার মনে হত প্রতিটা কথা যেন ওনার ৬০ বছরের কর্মজীবনের নির্যাস, যেগুলি আমার ভবিষ্যৎ কর্ম জীবনের পাথেয় হয়ে থাকবে । একদিন গাড়িতে যেতে যেতে জিজ্ঞাসা করেছিলাম জেঠু তুমি বোম্বে তে সেভাবে গেলে না কেন, উনি উত্তর দিয়েছিলেন _”বোম্বেতে গেলে টাকা হয়তো অনেক বেশি রোজগার করতাম, হয়তো না অনেক বেশিই করতাম, কিন্তু বাংলা সিনেমার প্রতি ভালোবাসাটাই আমাকে এখানে আটকে দিল”।একদিন ডাবিং এর পর উনাকে ছাড়তে গাড়ীতে করে যাচ্ছি আর তখনকার সময়ের শ্যুটিং নিয়ে কথা বলছি, কথা বলতে বলতে উনি এতটাই মশগুল হয়ে পড়েছিলেন যে ওনার বাড়ির সামনে গিয়েও গাড়ি দাঁড়িয়ে ,আমরা অনেকক্ষণ কথা বলে যাচ্ছি , হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে তাও উনি বাড়িতে ঢুকছেন না ওনার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে গাড়িতে বসে সেই সময়কার সিনেমা নিয়ে , সেই সময়কার কলকাতা নিয়ে কথা বলে যাচ্ছেন আর আমি নস্টালজিয়ায় ডুবে যাচ্ছি। ক্যামেরার সামনে আর ক্যামেরার পিছনে অদ্ভুত ট্রানজিশন লক্ষ্য করতাম। এমন অনেকবার হয়েছে মেকআপ রুমে উনি বেনু স্যার আর আমি বসে অনেকক্ষণ আড্ডা মেরেছি, অনেক গল্প করেছি, ওনার মুখে আবৃত্তি শুনেছি ।তখন মনে হয়েছে আমি যেন আমার বাড়ির দাদু জেঠুদের সাথে গল্প করছি। ওনাকে নামী আর কম দামী দের মধ্যে পার্থক্য করতে আমি অন্তত দেখিনি। কিন্তু ক্যামেরার সামনে উনি প্রচন্ড সিরিয়াস। একদিন একটা শটে একটু ভুল করার জন্য ওনার কাছে বকুনিও খেয়েছি। সেদিন শর্ট-এর পর ইন্দ্রানী দি আমায় বলেছিলেন ‘তুমিতো বিরাট ভাগ্যবান দেখছি, খুব কম অভিনেতাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে বকুনি খেয়েছে। উনি কাউকে ভালো না বাসলে তার ভুলটা ধরিয়ে দিতেন না ‘। উনি স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন না । আমি দেখেছিলাম উনি ওনার সময়কার ওনার সাথে কাজ করা শিল্পীদের সাথে ওনার স্টিল ছবি দেখতে পছন্দ করতেন, এটা বোঝার পর আমি যখনই কোনো পুরোনো দিনের ওনার সাথে কাজ করা শিল্পীদের ওনার সাথে ছবি মোবাইলে পেতাম ওনাকে নিয়ে গিয়ে দেখাতাম, আর উনি বলতেন এই ছবিটা তো এইখানে তোলা, তখন এই রকম হয়েছিল। এদের মধ্যে এরা এরা আজ আর নেই ।
আর আজ…………..
হসপিটালে ভর্তি হওয়ার আগেও ফোন করে খবর নিয়ে ছিলাম। কোভিড প্যানডেমিকের জন্য বাড়িতে যেতাম না। হসপিটালে ভর্তি হওয়ার পর নিউজ চ্যানেল ও চেনা পরিচিতদের মাধ্যমে ওনার খবর পেতাম। অনেকে আমার থেকেও ওনার খবর নিতেন।
ওনার শেষ যাত্রায় মানুষের আবেগ, মানুষের ভালোবাসা দেখার পর বুঝতে পারলাম _উনি শুধু কোলকাতার কোহিনূর না , উনি আপামর বাঙালির আসল “কোহিনূর” ছিলেন। যার নূর টা আজ হারিয়ে গেলো ।
আমি সত্যিই ভাগ্যবান যে আমি ওনার সান্নিধ্যে আসতে পেরেছিলাম’। আফসোস একটাই সেটা দীর্ঘায়িত হলো না।যেখানেই থেকো ভালো থেকো জেঠু।তোমার চিরশান্তি কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here