আপনি ভারী অসভ্য ইতর লোক তো! জর্জ বিশ্বাস বলেছিলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে

0
94

✍️পৃথা ঘোষ

পৃথা ঘোষ : ‍‍‌‌১৯৩১ সালের ১১ আগস্ট কলকাতার মুখুজ্জে বাড়িতে মায়ের কোল আলো করে এলো ছোট্ট ‘পল্টন’। পল্টন কে? পঞ্চাশের দশকের অন্যতম বিখ্যাত গায়ক।যার সুরে আসমুদ্র হিমাচল মোহিত হয়েছে, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। শৈশব থেকেই তিনি গান অন্ত প্রাণ।এই বিষয়ে তিনি কোনো রকম সামঝতা করতে নারাজ ছিলেন। যত বড় ব্যক্তিত্ব সামনে থাকুন না কেন, সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে হোক না কেন, তিনি আপষ করেননি। একবার নচিকেতা ঘোষের সাথে পুজোর গানের মহড়া চলছে। গানটি একেবারে তৈরি-‘বনে নয় মনে মোর’।অথচ গানের মুখড়া কিছুতেই মানবেন্দ্র বাবুর পছন্দ হচ্ছিল না। শেষ মেষ রাধাকান্ত নন্দীকে তিনি বললেন-তুই এক টুকরো বাজাতো। তিনি বাজালেন। এরপর মানবেন্দ্র বাবু-রাধাকান্ত বাবু উভয়ের তা মনে ধরলো। সেটাই মুখড়া করা হল। এদিকে নচিকেতা ঘোষের তা এক্কেবারে অপছন্দ।রাগ করে মহড়া ছেড়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে যদিও ফিরে এসে তিনি মানবেন্দ্র বাবুকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। আসলে আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনতে শুনতে গানটি তাঁরও মনে ধরেছিল।আর একবার ‘দেওয়া নেওয়া’ ছবির পরিচালক ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’ গানের রেকর্ডিং এর সময় বলে বসলেন, আপনাকে একটু খারাপ করে গাইতে হবে। কারণ? স্ক্রিপ্টের ডিমান্ড, গল্পের চরিত্র ভালো গান গাইতে পারেন না তাই। মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় জবাব দিলেন,তা হলে আমায় ডেকেছেন কেন! আমায় বরং ছেড়ে দিন।পরে যদিও উত্তমকুমারের মধ্যস্থতায় সমস্যার সমাধান হয়। সৃষ্টি হয় কালজয়ী সেই গান ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’।
সঙ্গীতের প্রতি এমন আনুগত্য, তাঁর এমন ব্যক্তিত্ব কেনইবা হবে না বলুনতো! তাঁর কাকা সঙ্গীতজ্ঞ রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায়। কাজী নজরুল ইসলাম রত্নেশ্বর বাবুর ভালো বন্ধু ছিলেন। নজরুল ইসলাম স্বয়ং তাঁকে গান শিখিয়েছিলেন। তাঁর ঠাকুরদা গজেন্দ্রনাথ ছিলেন সঙ্গীত অনুরাগী,নিজে গান গাইতেন। অনেক সময় রজনীকান্ত সেন গান লিখে গজেন্দ্রনাথকে দেখাতেন। মানবেন্দ্র বাবু বেগম আখতার, পন্ডিত রবিশঙ্কর, ওস্তাদ আলি আকবর খানের মতো মানুষের ছত্রছায়ায় সমৃদ্ধ হয়েছেন। মেহেদি হাসান একবার কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। স্টেজে উঠে জানত পারলেন দর্শক আসনে বসে আছেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। তিনি মঞ্চ থেকে বলে উঠলেন, মানবেন্দ্রজি আপনি একবার উঠে দাঁড়ান। আমি একবার অন্তত আপনাকে দেখতে চাই। শ্রদ্ধেয় শতা মঙ্গেশকর তাকে অসম্ভব সম্মান করতেন।
তখন তিনি কলেজের ছাত্র।নাম দিয়েছেন ইন্টার কলেজ কম্পিটিশনে। জানতে পারলেন, টপ্পা,ঠুংরির পাশাপাশি সেখানে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে হবে। এদিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে তিনি কখনও সেভাবে চর্চা করেননি। এরপর কাকার পরামর্শে তিনি জর্জ বিশ্বাসের কাছে গেলেন তালিম নিতে।সার্দান অ্যাভিনিউ এ তখন জর্জ বিশ্বাসের বাড়ির দরজা সবসময় খোলা থাকত। একদিন সকালে মানবেন্দ্র বাবু দরজা ঠেলে তাঁর ঘরে ঢুকে পড়লেন। সেই সময় তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। তারপর মশারি তুলে ঠেলাঠেলি করতেই তিনি ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন। বললেন, আপনি ভারী অসভ্য ইতর লোক তো! না বলে কয়ে ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত লোককে তুলে দিচ্ছেন ‌। এরপর কথোপকথন এগোল। জানতে পারলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় রত্নেশ্বর বাবুর ভাইপো।সব শুনে জর্জ বিশ্বাস জিজ্ঞাসা করলেন, প্রতিযোগিতা কবে? উত্তর এলো, আজ বিকেলে। জর্জ বিশ্বাস অবাক। তারপর তিনি তাঁকে ‘ধরা দিয়েছি গো আমি আকাশের পাখি’ গানটি শেখান। কাকতালীয় ভাবে সেই প্রতিযোগিতার অন্যতম বিচারক জর্জ বিশ্বাস ছিলেন। তিনি যদিও মানবেন্দ্র বাবুকে কোন নম্বর দেননি। তবে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায় সেই কম্পিটিশনে জয়ী হন।
১৯৫৪ সালে উত্তমকুমার অভিনীত চাঁপাডাঙার বউ ছবিতে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে।তিনি তাঁর সুরের মূর্ছনায় আমৃত্যু শ্রোতাদের মনোরঞ্জন করেছেন। বাংলা গানের স্বর্ণ যুগের অন্যতম কান্ডারী ছিলেন তিনি। সাড়ে চুয়াত্তর ছবিতে একটি ক্যামিও চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন।
১৯৯২ সালের ১৯শে জানুয়ারি তিনি তাঁরাদের দেশে হারিয়ে গেলেন ‌। তাঁর বড়ো ইচ্ছে ছিল একটি মিউজিক্যাল বায়োস্কোপ বানানোর।যার জন্য তিনি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের থেকে পাঁচশো টাকার বিনিময়ে জলসাঘর কাহিনীর স্বত্ত্বও কিনেছিলেন। তবে নানা কারণে সে আশা অপূর্ণ রয়ে গেছে। কিন্তু তার সৃষ্টি শ্রোতাদের হৃদয়ে আজও তাঁকে অমর করে রেখেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here