অবলম্বন

0
18


✍️সহদেব মন্ডল

ছোট একটা কুঁড়ে ঘর।টালির ছাদ।দুটো মানুষের বাস-বৃদ্ধ কালশশী বৈদ্য আর তার স্ত্রী পঞ্চমী।এমনিতেই শুনশান বাড়ি।বাড়িতে যে কেউ আছে তা টের পাওয়া যায়না।একমাত্র বুড়োর কাশি মাঝে মাঝে জানান দেয় বাড়িতে কেউ আছে।কালশশীর পাঁচ ছেলে মেয়ে।সবারই বিয়ে হয়ে গেছে।যে যার সংসার নিয়ে ব্যস্ত।মাঝে একখানা নির্জন দ্বীপের মতো বুড়ো বুড়ির সংসার।আশি উর্ধ কালশশী আজ পাঁচ বছর হাঁটা চলা করতে পারেনা।বিছানা তার একমাত্র ঠিকানা।পঞ্চমী কিন্তু এখনও বেশ সুস্থ সবল।বাজার করা,রান্না বান্না,ঘরমোছা থেকে শুরুকরে ঘরের সমস্ত কাজ সঙ্গে কালশশীকে খাওয়ানো,স্নান করানো,প্রস্রাব পায়খানা পরিষ্কারকরা। সমস্ত কিছু করে।ওদের ছেলে ছেলের বউ,নাতি নাতনি করে এখন পঁচিশ জন।এই বেকারত্বের রমরমার বাজারে ব্যস্ততা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।বেশির ভাগের হাতে কাজ নেই কিন্তু সবাই বলে ভীষণ ব্যস্ত।কারও হাতে একটুও সময় নেই।বুড়ো মানুষের কাছে একটু সময় কাটানো,তাদের সুখ দুঃখের খবর নেওয়া বা টুকি টাকি একটু ,জল এনে দেওয়া কিংবা ওষুধ কিনে দেওয়ার মতো লোক নেই।সব চেয়ে মনে বাজে এই সময় একটু গল্প করার মতো,অনুভূতিগুলো ভাগ করে নেওয়ার মতো কেউ নেই।কালশশীর সারা জীবনের প্রবাহ যেন হঠাৎ করে গতি হারিয়ে ফেলেছে।সময় যেন কাটতে চায়না আর।একাকীত্ব চেপে বসেছে মনের মধ্যে।সারাজীবনের এত অভিজ্ঞতা,এত গল্প,আজ ভাগ করার মতো একজন ও নেই।যারা এই বার্ধক্যে সবচেয়ে বড় সাথী সেই নাতি নাতনিরা তো কাছেই গেঁষেনা।আজ যেন জীবনের সমস্ত বাহুল্য ছেঁটে গিয়ে আবশ্যিকটুকু দুটো প্রাণ বেঁচে আছে।বন্ধু বলো,প্রতিদ্বন্দ্বী বলো,ঝগড়ার সাথী বলো,কিংবা সুখ দুঃখের অংশীদার সব কিছুই যেন দুজন দুজনের মধ্যেই খুঁজে নিতে হয়।একে অপরের মধ্যে থেকে সব চাহিদাগুলো মিটিয়ে নিতে হয়।সব সম্পর্ককে খুঁজে নিতে হয় একে অপরের মধ্যে থেকে।না পেলে ও তা মেনে নিতে হয়। আর মনের মধ্যে বুদ বুদিয়ে ওঠে হাজার অভিমান যার মূল্য কেউ হয়তো কখনও দেবেনা।
শৈশবের খেলাধুলা,কৈশরের ঝঞ্ঝা ময়তা,যৌবনের রঙ্গ রসিকতা,পৌঢ় বয়সের দায়িত্বশীলতা শেষে শুধুই থেমে থাকা,স্থিরতা,স্মৃতি রোমন্থন করা,আর নস্টালজিক হয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।কালশশী ভাবে সেই প্রথম যৌবনের দিন গুলোর কথা।পঞ্চমী তখন কত ছোট।ভালো করে বুকের গঠন আর যুবতী মনের পরিপক্কতা আসেনি। কত ভুল করতো ও ।কত ছেলে মানশী ফুটে উঠতো ওর আছে কথায়,ব্যবহারে।সঙ্গে কাঁচা খাঁটি ভালোবাসা।দীর্ঘ বাষট্টি বছর একসঙ্গে থাকার মাঝে কত রাগ,অভিমান,ঝগড়া,আবার ছিল ভালোবাসা।সেই বাঁধভাঙা ভালোবাসা সবকিছুকেই ছাপিয়ে যেত।সব খারাপ লাগা মুছে যেত ভালোবাসার একটু আদরে।কালোশশীর বাবা অর্থাৎ পঞ্চমীর শ্বশুর ছিলেন ভীষণ বদরাগী।কমবয়সী ছেলের বউ সামান্য ভুল করলে তার উপর নেমে আসতো শাস্তি।বাক্যবাণ নিক্ষেপ করে তিনি যে ক্ষান্ত হত তেমনটা নয় শারীরিক ভাবে ও নিপীড়ন চালাতে কসুর করতনা।অনেক সময় এমন হয়েছে অনেক খাটা খাটুনির পর পঞ্চমীর ভাত বেড়ে খেতে যাবে এমন সময় এক আঁচলা ময়লা আবর্জনা নিয়ে ভাতের থালায় দিয়ে গায়ের ঝাল মেটাত বুড়ো।বেচারি পঞ্চমী সারাবেলার খাটুনি আর যৌবনের বাড়ন্ত বয়সের খিদেয় কাতর হয়ে ঘরের কোণে বসে বসে কাঁদতো।কিছু চোপা করা বা অন্য কোনো ওজর আপত্তি করার সাহস হতোনা।এমন পরিস্থিতিতে কালশশী বাপের ভয়ে কিছু বলতে সাহস পেতনা । পঞ্চমীর এই দুঃখ তাকে খুব কষ্ট দিত ।সে লুকিয়ে লুকিয়ে মুড়ি,গাছের পেয়ারা,আম,শশা এনে দিত। খেতে খেতে পাঞ্চমীর মুখে ফুটে উঠত তৃপ্তি।তার ছটা ছড়িয়ে পড়ত কালশশীর চোখে মুখে মনে।প্রিয় মানুষটার দুঃখে তার পাশে দাঁড়ানো,তাকে তৃপ্ত করার এক অনন্য আনন্দ তাকে পূর্ণ করতো।তাকেও তৃপ্ত করতো এক দুর্বোধ্য মিঠে মিঠে অনুভূতি।কিন্তু মুখের মেকি ভালোবাসা সে প্রকাশ করতে পারতনা কোনোদিনও।তখন পঞ্চমীর সেই মায়াময় চাহনি অব্যক্ত ভাবে অনেক কথা বলে যেত।তাকে কি বলে তা কালশশী বা পঞ্চমীর কাছে ছিল অজানা।কিন্তু যেটুকু পড়ে যুবক কালশশীর মনে এক আনন্দ অনুভূতি উপচে পড়তো। সেই অনুভুতিটা আটকে রেখেছিল দুজনকে এই রুক্ষ যন্ত্রণাময় সংসারে।তারপর একে একে মনে পড়ে যায় বড়ছেলে মদন হওয়ার সময় সে কি চিন্তা,এক চূড়ন্ত মানসিক চাপ,কি উদ্বিগ্নতা,-কিছু হয় কি হয় দুরু দুরু বুকে পাশের ঘরে কান পেতে থাকা।সন্তানের প্রথম মুখ দর্শনে সৃষ্টি সুখের ঈশ্বরত্ব লাভ করা।সেই সুখ স্মৃতি এই শূন্য পাতা ঝরার সময় ও কালশশীর মন কে খুশিতে ভরিয়ে দেয়।আজ যত কথা যত আবদার যত রাগ অভিমানের সাথী তার পঞ্চমী।সেই একই ভাবে পাশে আছে আজও।অন্যদিকে বুড়ো এখন অনেক সময় খাবার দিতে দেরি হলে কিংবা খাবারের স্বাদ ভালো না হলে কিংবা অন্য কোনো ছোট খাঁটো ভুল হলে বুড়ো এখন বুড়ির উপর চিৎকার করে গালাগাল করে।পঞ্চমী বসে বসে কাঁদে।রাগের মাথায় সেও পাল্টা গালমন্দ করে টানা অনেকক্ষন ধরে।বলে,-
ঘাটের মোড়া বুড়ো তোর কাজ কোরবার মুরোদ নি শুদু বসে শুয়ে বড় বড় মেজাজ আচে ।মরেনা হাজেনা খাটে বোসে বোসে শুদু আমার হাড়মাস জেইলে খেলে।
সত্যি পাঞ্চমীর কষ্ঠ হয়।যত হোক তারও তো বয়স হয়েছে।এই বয়সে এত ধকল তাকে বইতে হয়।মাঝে মাঝে মনের কোনো দুর্বল মুহূর্তে তার মনে হয় বুড়োটা বোঝার মতো মাথার উপর চেপে আছে ।ওর হাত থেকে রেহাই পেলে বাঁচি।
আষাঢ় মাসের সন্ধ্যা।সারাদিন মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে।চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে দিচ্ছে ঝিঁ ঝিঁ পোকার ঝিঁ ঝিঁ শব্দ আর দূরে জলা জমি থেকে আসা ব্যাঙের ডাক।বৃষ্টির সন্ধ্যায় যে যার ঘরে বসে টি ভি সিরিয়াল আর তাসের আড্ডায় মজে আছে।এখানে অল্প আলোর নির্জন বাড়িটার অন্ধকারটা যেন আজ একটু নিবিড় হয়ে এসেছে।কালশশীর হাঁপানিটার টানটা বেড়েছে হঠাৎ করে।হাঁপানির ওষুধটা শেষ হয়ে গেছে প্রায় একমাস হলো।নানান কাজের মাঝে আর নিয়ে আসা হয়নি।ছেলেদেরকে কাজ হয়নি।হাঁকিয়ে দিয়েছে।বাজে অজুহাতে পাশ কাটিয়ে গেছে সকলেই।আজ এই বৃষ্টির রাতে এই বয়সে কি যে করবে কিছু ভেবে পাচ্ছেনা পঞ্চমী।হাঁপানির টানে বুড়োর দুর্বল শরীরটা যেন কুঁকড়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে।অসহায় পঞ্চমী ডুকরে কেঁদে ওঠে,-“বাবা মদন,হারান ,গঙ্গা ছুটে যায় ,তোদের বাবা মরে যাচ্ছেরে বাবা।”অনেক ডাকাডাকি আর কান্নাকাটির পর ছেলেরা অবশ্য এসেছিল।কিন্তু তাদের চলন বলন আর কথা বার্তা শুনে মনে হয়না তারা খুবই চিন্তিত বাবার এই অবস্থাতে।বরং তাদের হাবভাব দেখে মনে হলো তারা আশা করে এসেছে বুড়োটা এবার যাবে।ঝামেলা বিদায় হবে।যে ঝামেলা তারা কখনোই পোহায়নি সেই অজানা ঝামেলা ও যেন তাদেরকে চেপে বসেছে।হাঁপানির তোড়ে বুড়ো নেতিয়ে পড়ে ,চোখ বন্ধ হয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় এক সময়।পঞ্চমী চোখের সামনে যেন সব অন্ধকার মনে হয় । আজ যেন মনে হচ্ছে সারাটা পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।এক মুহূর্তে সমস্ত পৃথিবীটা যেন শূন্য।সহায় সম্বলহীন মনে হতে লাগলো নিজেকে।যেন এই পৃথিবীতে বাঁচার অবলম্বনটুকু আজ শেষ হয়ে গেল।
যৌবনের যৌন সুখের আশা নেই।আর্থিক ভাবে এক পয়সা রোজকার করতে পারেনা।একটা কাজে সাহায্য করা তো দূরের কথা তার পিছনে খাটতে খাটতে জীবনটা তিত হয়ে ওঠে।বিনিময়ে বকুনি,গালাগাল এইতো জুটত।তবুও সে যেন ছিল সব সুখ দুঃখের সাথী,বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য,একাকিত্বের সাথী।তার উপস্থিতি টুকু যেন আজ মহার্ঘ মনে হচ্ছে।জীবনের এই প্রান্তে এসে এত গভীর টান, এত গভীর আত্মিক বাঁধন যে তার যাওয়াটা যেন আজ নিজের অস্তিত্বকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর মধ্যে পাড়ার ডাক্তার শ্যামল সরদার চলে এসেছে চিৎকার চেঁচামিচির আওয়াজে।হাতের নারী টিপে দেখলো ,চোখ দেখলো।তারপর বলল ,-কান্নাকাটি করোনা ঠাকমা ।চেষ্টা করে দেখি কি করা যায়।তারপর ওষুধের ব্যাগটা খুলে একটা সিরিঞ্জ আর কয়েকটা এম্পিউল নিয়ে ইনজেকশন রেডি করে।পর পর গোটা তিনেক ইনজেকশন দিয়ে ।বুড়োর হাতে পায়ে গরম তেলে মালিশ করে দেয়।
এতক্ষন কোথায় কি হচ্ছিল পাঞ্চমীর কোনো হুঁশ ছিলনা।কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে কালশশী চোখ মেলছে।হঠাৎ একটু কানাকানি হাসাহাসিতে পাঞ্চমীর যেন সম্বিৎ ফেরে।সে চোখ তোলে আস্তে আস্তে। বুড়োর সেই ধীরখোলা চোখ যেন মৃত্যুর অতল তল থেকে ফিরে আসা জীবনের আলোয় কাকে যেন অনবরত খুঁজে চলেছে।পঞ্চমী এমন দৃশ্য যেন নিজের চোখকে ও বিশ্বাস করতে পারছেনা।একটা খুশির তরঙ্গ জীবনের উৎস হয়ে দোল দিতে লাগলো মনের ভেতরটায়। বৃষ্টির দুর্যোগ কেটে গেছে।সামনের নিম গাছের মুষড়ে পড়া ডালটায় গজানো নতুন পাতার থেকে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা খুশির অশ্রু মাটিতে পড়লো।দূরের আলোটা হঠাৎ করে জ্বলে উঠলো আবার। হওয়ায় দুলতে থাকা পাতার উপর জমা জলে সেই আলো পড়ে ঝিলিক দিয়ে যাচ্ছে ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here